বিশ্বমাঝে বাংলাদেশের লোকসংগীত এক বিশেষ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত। এই প্রতিষ্ঠার পেছনে আজীবন যারা নিরন্তর সুরসাধনায় নিমগ্ন ছিলেন, আবদুল আলীম তাদেরই একজন। চল্লিশ দশকের শুরু থেকে সত্তর দশকের মাঝামাঝি যার কণ্ঠ ভাটিয়ালি সুরের চুড়ো ছুঁয়েছিল সেই ভাটিয়াল সম্রাট আবদুল আলীমকে নিয়ে কেউ কলম হাঁকেনি কেন তা বোধে আসে না। ঐ সময়ের কোনো সংগীতরসিক কি আছেন, যে আবদুল আলীমে মজেননি?
জীবনভর আবদুল আলীম কেবল ভাটিয়ালি গাঙে নাও বেয়ে চব্বিশটি বাঁকে তার নাও ভিড়িয়েছেন। তিনি নাও ভিড়িয়েছেন প্রার্থনা, প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, আত্মোপলব্ধি, আত্মজিজ্ঞাসা, মারফতি, মুর্শিদি, কীর্তনাঙ্গ, বাউল, জারি, সারি, জীবনমুখী/কর্মসংগীত, ইসলামি, ইসলামের আহ্বান, ভক্তিমূলক, হাম্দ নাত, দেশাত্মবোধক, শিশুতোষ, সম্প্রদায়, পুঁথি, নাইয়োর আকুতি, খুনসুটি, উর্দু ভাটিয়ালি বাঁকে। ভাটিয়ালির এতগুলো ভাইটাল বাঁকে আর কোনো শিল্পী তার নাও ভিড়িয়েছেন সেরকমটি জানা যায় না। জানা যায় শিল্পীর রেকর্ডিয় গানের সংখ্যা ৩০০, সিনেমায় গাওয়া আরো ১০০। জোগাড় করা গেছে ১৮৭টি। এর মধ্যে কোনো কোনো গান দুটি আবার কোনো কোনো গান তিনটি রেকর্ডে বাণীবদ্ধ হয়েছে। সব গান নির্ভেজাল ভাটিয়ালি । অর্থাৎ এক কথায় বলা যায় তিনি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন ভাটিয়াল সুরের।
এ গ্রন্থে উদ্ধৃতি হিসেবে ২৪টি পর্বের ১৪২টি গানের লিরিক সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বেশি ভাগ গানই সংগৃহীত লোকসংগীত। লালন, জসমীউদ্দীন, কাজী নজরুল ইসলাম, জালালউদ্দীন খাঁ, মিরাজুল ইসলাম, মমতাজ আলী খান প্রমুখ মহাজনের লেখা গানও তিনি কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন। তাঁর নিজের লেখা কোনো গান নেই। তাই আবদুল আলীমের গান না বলে আবদুল আলীমের গাওয়া গান বলার চেষ্টা করেছি। এই প্রচেষ্টা মোটেও বাণিজ্যিক নয়। এটি নতুন প্রজন্মের কাছে শিল্পী আবদুল আলীমকে কেন 'ভাটিয়াল সম্রাট' বলা হয়েছে তার একটি প্রামাণ্য দলিল মাত্র।
লেখক
সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। চিরসত্য কথাটি মানি। তবে এও জানি, করে। সময় অপেক্ষা করে থাকে কবে পৃথিবীর বুকে একজন আবদুল আলীম জন্ম নেবেন। যাঁরা জয় করার ক্ষমতা নিয়ে ভূমিষ্ঠ হন। যাঁরা উল্কার মতো পৃথিবীতে আসেন জয় করেন আবার মিলিয়ে যান। জয়ের জন্য তাঁদের দেশ, কাল, স্থান, প্রথাগত শিক্ষা, অর্থ, সম্পত্তি কিছুই প্রয়োজন হয় না। রেখে যান মানুষের জন্য নতুন সংবাদ। তাঁর একটি সংবাদ জন্ম দেয় শত শত নতুন সংবাদ। আবদুল আলীম তেমনি জয়ী এক যোদ্ধা। শৈশবে, সম্ভবত ১৯৭২ সালে বিটিভিতে প্রথম দেখেছি। সুঠাম দেহের সরল এক সু-পুরুষ। তাঁর সেই দরাজ কন্ঠের মর্মস্পর্শী সুর এখনও হৃদয়ে অনুরণিত হয়। তাঁর কণ্ঠে 'সব সখীরে পার করিতে নেব আনা আনা সকল বাঙালি হৃদয়কে প্লাবিত করেছিল। মনে পড়ে নৌকা পথে যাওয়া এক পিকনিকের কথা। যাওয়া এবং আসার পথে নৌকাতে কেবল ঐ একটি গানই বাজানো হয়েছিল। সকলেরই জানা 'পুঁথি পাঠের একটি বিষয় অথচ তা গেয়ে শোনালেন আবদুল আলীম। তাঁর 'নাইয়োর আকৃতি'র গানগুলো এখনও বহু চোখ থেকে পানি ঝরায়। ভাটিয়ালি গান নিয়ে তাঁর কাছাকাছি কেউ যেতে পেরেছেন বলে ভাবনায় আসে না। আবদুল আলীম ভাটিয়ালি রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি ।
'ভাটিয়াল বরপুত্র আবদুল আলীম' এক কথায় আবদুল আলীমকে চিনতে এর চেয়ে উপযুক্ত উপাধি হতে পারে বলে মনে হয় না। কেন? সে প্রসঙ্গের মীমাংসায় অগ্রসর হতে চাই ।
আবদুল আলীমের গাওয়া সকল গানের গীতিকার ও সুরকার এখনো সনাক্ত করা হয়নি। এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে। আবদুল আলীমের নামের পূর্বে যে সকল বিশেষণ সর্বাধিক দেখা যায় সেগুলো হলো দরদি শিল্পী, মরমি শিল্পী, দরাজ কণ্ঠশিল্পী, পল্লীগীতির অমর কণ্ঠশিল্পী, বাংলা লোকসংগীতের অমর কণ্ঠশিল্পী ইত্যাদি। এর সবকটিই সত্য। কথা হলো এর কোনোটি দিয়ে কি পূর্ণাঙ্গ আবদুল আলীম প্রকাশিত হলো? একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যায় হলো না। কারণ এগুলো সবই তার কন্ঠের সুর, কণ্ঠের বলিষ্ঠতা, কন্ঠের আবেগ, কন্ঠের গভীরতা, বাংলা লোকসংগীতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী কণ্ঠ ইত্যাদি কেবল কণ্ঠবাচক। লোকসংগীতের কোন ক্ষেত্রে, কতটা অবদান তিনি সচেতনভাবে রেখে গেছেন এই রচনায় গোটা আবদুল আলীমের পাশাপাশি ক্রমান্বয়ে তারই উন্মেষ ঘটাতে চাই।