বর্তমান শুদ্ধ সংগীতের অচলায়তনে, আমরা বসে আছি নিখাদ বাংলা গানের পসরা সাজিয়ে। আমাদের সঙ্গে আছেন নিধুবাবু, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুল প্রসাদ, রজনীকান্ত, ডি.এল রায়, হাসন রাজা, লালন প্রমুখ। এঁরাই আমাদের শক্তি, এই গান আসন পেতে বসে বিগত দুইশত বছর আমরা একাগ্রতার সাথে শুনে আসছি। এই বাংলা গানে প্রাণ আছে, ধ্যানের যোগ আছে। গানের তন্ময়তায় ডুবে সুরের সাথে হাত ধরাধরি করে ভেসে যাওয়া যায় রূপ থেকে অরূপে, অরূপ থেকে অপরূপে। কিন্তু শুরু বিনা এই গান হয় না। চটকদারী শিল্পী হবার টেকনিক্যাল পথ এখানে নেই। এই গানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন গুরুভক্তি অতঃপর স্বকাম শিক্ষা ক্রমান্বয়ে সংগীত সাধনা সর্বোপরি একটি পরিশীলিত মন আর পরিমিতবোধ। মূলধারার এই সংগীত চর্চায় কতবড় শিল্পী হওয়া যায় তা ঠিক জানি না তবে এই চর্চা মনেপ্রাণে একজন সংস্কৃতিবান মানুষ হবার সহায়ক ।
আমরা অনেকেই মনে করি। এখন বাংলা গানের ক্রান্তিকাল। একথা সত্য যে, বর্তমান বাংলা গানের তটিনীতে যুৎসই গীতিকবি, দক্ষ সুরকার নিতান্তই অপ্রতুল। বিশ্বায়নের জোয়ার, ইংলিশ মিডিয়াম নামক অপূর্ণাঙ্গ শিক্ষার হিড়িক, বিজাতীয় সংস্কৃতির মোহে উন্নত্ত ভারুণ্য আর আকাশ সংস্কৃতির দাপটে আমাদের বাংলা সংস্কৃতির শুভ্র পাখনায় লেগেছে বহ্নিশিখা। তারপরেও শহুরে ব্যস্ত রাস্তায় চকিত বাঁশীর সুর আমাদের উদাস করে। হঠাৎ ভেসে আসা বাউল গানের সুরে মৃত্তিকার গন্ধ উঠে আসে ব্যস্ততার শিকড় কুঁড়ে, এরই নাম মেঠোসুর-বাংলা গানের অন্তর্জাত আপন সুর
বাংলা গানে অলীক কল্পনার বেসাতি নেই। এই গানে মহাভারতের যুধিষ্ঠিরের ন্যায় ধ্রুববাণী কিংবা মন্ত্রবাণী নেই কিন্তু কেমন জানি একটা নির্মল আনন্দ আর মায়া আছে, মায়ের শাড়ির গন্ধ আছে। আমরা যারা কায়ামনে বাঙালি, এই বাংলার জন্য বাংলা গানের জন্য তাদের অনেক কিছু করণীয় আছে। সংগীতপ্রেমী ও গবেষক শাকির দেওয়ান তাঁর সম্পাদনায় তুলে এনেছেন বাংলা গানের প্রাণপুরুষের জীবন কর্মের পাণ্ডুলিপি। কবি নজরুল পরবর্তী বাংলা গানের দিকপালদের নিয়ে এই ধরনের প্রকাশনা অপ্রতুল। 'গানের মানুষ প্রাণের মানুষ' শীর্ষক এই অনন্য প্রকাশনা সংগীতপ্রিয় মানুষ, শিল্পরসিক ও সংগীত বিষয়ক শিক্ষার্থীদের সহায়ক হবে।
কাইলাম না কারী ১
(শাহনাজ নাসরীন)
চেয়ারম্যান সংগীতবিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সংগীতই বোধকরি বিমূর্ত শিল্পের সর্বোচ্চ প্রকাশ মাধ্যম। সংগীতের মাধ্যমে মানব জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, আশা-নিরাশার কথা ব্যক্ত হয়। আমরা অনেক সময় গানের মধ্যদিয়েই প্রেম-বিরহের অনিন্দ্য সুখানুভূতির ছোঁয়া পেতে চাই। গানের মাঝে আমরা জীবনের মিল খুঁজি । তাইতো গান ছাড়া জীবনকে ভাবা যায় না। সংগীত বিবর্জিত জীবন স্থবির। অচলায়তন। এক কথায়, মানুষের আত্মার বিকাশের জন্য যা জরুরী, তাই গান। বাংলা গানের ইতিহাস অতীব প্রাচীন। কবে, কার আমলে এর উৎপত্তি হয়েছিল এ সবের অনুপুঙ্খ তথ্য খুঁজতে যেয়ে আমার নাকাল অবস্থা। তবে ঘাঁটাঘাঁটির ফল একেবারে বৃথা যায়নি। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন যে চর্যাপদ এ বিষয়ে দ্বিধাহীন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছি। চর্যাপদের রচনাকাল অষ্টম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী। এই চর্যাগীতিকাই বাংলা গানের আদি রূপ। দ্বাদশ শতাব্দীতে জয়দেব 'গীতগোবিন্দ' রচনা করে অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেন । বাংলা গান নবদিগন্তের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়ায়। রাজা-মহারাজাদের হার্দিক পৃষ্ঠপোষকতায় গানগুলো হয়ে ওঠে জনপ্রিয়। পাল রাজাদের সময়েও গানের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এ সময় ‘মঙ্গলগীত' নামে এক ধরনের গান তুঙ্গীয় শ্রোতাপ্রিয়তা লাভ করে । 'মঙ্গলগীত' মূলত সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়কে উপজীব্য করে রচিত গান। এর অব্যবহিত পরেই 'কীর্তন' গানের আবির্ভাব। বিদ্যাপতি এবং চণ্ডিদাস ছিলেন কীর্তনের রূপকার। চৈতন্যদেবের ভাবশিষ্য বৃন্দাবন দাস, মুরারী দাস এবং গোবিন্দ দাস 'কীর্তন' গানে তাদের অবদানের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। মোঘল যুগে উপমহাদেশে সংগীতের যুগান্তকারী বিস্তৃতি ঘটে। উচ্চাঙ্গ সংগীতের শ্রেণীবিন্যাসও হয় এ সময়েই। মোঘল সম্রাটগণ প্রত্যেকেই সঙ্গীতানুরাগী ছিলেন। কথিত আছে, ১৫৩৫ সালে সম্রাট হুমায়ুন মাণ্ডু দখল করেন। সেসময় বাচ্চু নামক জনৈক বন্দির কণ্ঠে গান শুনে হুমায়ুন এতোটাই মুগ্ধ হন যে, বন্দিকে মুক্তি দিয়ে নিজ দরবারে গায়কের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন। মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে সংগীতের ঋদ্ধি সম্পর্কে অনেকেরই জানা । আকবর নিজেই ছিলেন পুরোদস্তুর সংগীতজ্ঞ। তিনি ছিলেন সুরস্রষ্টা। তাঁর শাসনামলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অগুন্তি ইরানি, তুরানি, হিন্দুস্থানি সংগীত শিল্পীকে তিনি তাঁর রাজ দরবারে স্থান দিয়েছিলেন।
সম্রাট আকবরের আমলে সংগীতে সর্বাপেক্ষা খ্যাতি অর্জন করেন তানসেন।