পটভূমি
মরমী ও সুফিকবি হাছন রাজা মাটির পিঞ্জিরা তথা দেহ খাঁচার মাঝে আত্মার বন্দিত্বের অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন প্রেমিক হৃদয় দিয়ে। প্রেমিক হচ্ছে সে যে নিজের আমিত্বকে হারিয়ে খুঁজে পায় প্রেমাস্পদকে। অতীন্দ্রিয়তার পথে সর্বোচ্চ পথপ্রদর্শক ইশক। হৃদয়, মন এবং আত্মার প্রতিটি কোষ ক্ষতবিক্ষত হলেও একটি অন্ধকার শূন্যতার মাঝে আলোকোজ্জ্বল উপস্থিতির কামনা প্রেমিকের চলার প্রেরণা। প্রেমিক হাছন রাজার তীব্র কামনা পরিশীলিত অন্তর উন্মত্তভাবে পরমসত্তার দিকে ছুটে চলে। সে চলার পথে মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি আত্মা প্রেমাস্পদের সহিত মিলনের ব্যাকুলতাকে হাছন রাজা তাঁর মরমী সংগীতের ভেতর প্রকাশের প্রয়াস চালিয়েছেন। মানবর্তনে বিরাজিত দেহের সাথে রূহ সত্তাটি নফসের সাথে মিশে একই অবস্থানে বাস করে। অথচ একত্রে বিরাজমান হওয়া সত্ত্বেও তাকে ধরা ছোয়া যায় না। মাটির নির্যাসে তৈরি আদম সন্তানের মাঝে রূহের সেই অবস্থার বর্ণনা দিতে হাছন রাজা তার মনের ব্যাকুলতার কথা বলেছেন,
মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে
কান্দে হাছন রাজার মন মনিয়া রে ॥
মায়ে বাপে কইলা বন্দি খুশির মাঝারে
লালে ধলায় বন্দি হইলাম পিঞ্জিরায় মাঝারে রে।।
হাছন রাজা মাটির পিঞ্জিরার ভেতর আত্মার চূড়ান্ত চেতনার মধ্যে, মাহাত্ম্যের যে-ব্যবধান তা ঘুচাতে চান পরমের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে। প্রেমাস্পদের প্রতি তাঁর পবিত্র আকর্ষণ। তিনি দেহ পিঞ্জিরার সকল বাধা অতিক্রম করে পরমাত্মার সাথে মিলিত হতে চান। তাঁর দেহের আশ্রয় থেকে একই অবস্থানে পরমের বাস হলেও তা যেন অধরাই রয়ে গেছে। যার ফলে ব্যক্তি হাছন রাজার বন্দি আত্মার কথা ভেবে তিনি তার বিরহ জ্বালায় কাঁদেন নিশিদিন। আত্মার অবগুণ্ঠন খুলে যাতে দেহাতীত সত্তা হৃদয়ের কন্দরে তাঁর চূড়ান্ত চেতনায় এসে ধরা দেন। এবং তিনি যেন তাঁর প্রেমের সুরা পান করতে পারেন অতঃপর স্বৰ্গীয় ভালোবাসা স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে তাঁর বিজয় ঘোষণা করতে পারেন। হাছন রাজা সে কথাই ব্যক্ত করেছেন তাঁর সংগীতে।
হাছনের সংগীতগ্রন্থ 'হাছন উদাস' কবে প্রকাশিত হয়েছিল ও তাঁর মোট গানের সংখ্যা কত? এ নিয়ে সঠিক তথ্যের অভাব আছে। হাছনের জীবিতকালে কিছু গান নিয়ে 'হাছন উদাস' নামে তাঁর একমাত্র সংগীত গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এর সঠিক প্রকাশকাল জানা না গেলেও অনুমান করা হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের কোনও এক সময়ে এটি প্রকাশিত হয়। তাঁর মৃত্যুর (১৯২২ খ্রি.) পর জ্যেষ্ঠ পুত্র দেওয়ান গণিউর রাজা চৌধুরী ১ম সংস্করণে গানের কিছু সংস্কার করে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে এটির ২য় সংস্করণ প্রকাশ করেন। এই দু'টি সংস্করণই বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য। পরে জানা যায়, 'হাছন রাজার সংগীতমালা'র (১৯৯৯ খ্রি. প্রকাশিত) সংকলক অমিয়শঙ্কর চৌধুরী উক্ত বইটির ১ম ও ২য় সংস্করণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। প্রভাতকুমার শর্মার ছিন্ন কপিতে ছিল ১-৩৪ পৃষ্ঠা, শেষের বাদবাকি পৃষ্ঠাগুলো নেই। বইটি ছাপা হয়েছিল মুসলমানী পুঁথির আকারে এবং তা শুরু হয়েছিল ডান থেকে বাঁদিকে। মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের মতে এই বই ছাপা হয়েছিল ১৯০৭ খ্রি.। অবশ্য অধ্যাপক আজরফ তাঁর ধারণা থেকে বলেছেন- 'আমার যতদূর মনে পড়ে ভাইয়ার (হাছন রাজা) 'হাছন উদাস' তাঁর জীবিতকালে প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯১৪ ইংরেজিতে। ছাপা হয় সিলেট রহমানিয়া প্রেসে।'
সূত্র-ঢাকার দৈনিক সংবাদ, ৩০ আশ্বিন ১৩৮৩, আবুল আহসান চৌধুরীর প্রবন্ধ 'প্রসঙ্গ হাছন রাজ একই রকম অভিমত ব্যক্ত করেছেন হাছন-চরিতকার আবু সাঈদ জুবেরী এবং মোবারক হোসেন খান। যাই হোক ১৯১৪ খৃস্টাব্দের এই মুদ্রণকে ১ম সংস্করণ বলে এঁরা মনে করেন। তথ্যপ্রমাণ ছাড়া এই মতকে মেনে নিতে দ্বিধা রয়েছে। কেননা প্রভাত কুমারের অর্ধাছিন্ন কপিতে মুদ্রিত ছিল-'শ্রীহট্ট ইসলামিয়া প্রেসে, শ্ৰী মুহাম্মদ আবদুল গণি দ্বারা মুদ্রিত। শ্রীযুক্ত জমিদার দেওয়ান হাছন রাজা কর্তৃক রচিত ও প্রকাশিত। তবে প্রকাশের কোনও সাল বা তারিখ উল্লেখ ছিল না প্রভাত কুমারের কপিতে। অতএব, ১ম সংস্করণে ইসলামিয়া প্রেস থেকেই মুদ্রিত এটি তথ্যসিদ্ধ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তবে কোন্ সালে তা জানা নেই। হতে পারে আবদুল হাই কথিত ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দ, তবে তারও তেমন কোন তথ্য প্রমাণ মেলে না। শুধু অমিয়শঙ্কর বলেছেন যে ইসলামিয়া প্রেসের কাজ-কর্ম ঊনবিংশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল, অতএব ১৯০৭-এ দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হয় হাছন-পুত্র দ্বারা ১৭ বৈশাখ ১৩৩৩ সুনামগঞ্জ থেকে। (ভূমিকা বাদে) এটিকে আমরা ২য় সংস্করণ বা মুদ্রণ বলতে পারি। অবশ্য আবদুল হাই বলেন (তথ্য ছাড়াই), ২য় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৪ খ্রি.। হাছনের গানের সংখ্যা যে কত, তারও ঠিক-ঠিক হিসেব নেই। অমিয়শঙ্কর তাঁর বইতে 'হাছন উদাস'-এর