আবহমান কাল থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহের যে জেলাটি লোকসাহিত্যের ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে, সে হলো নেত্রকোণা জেলা। ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের নির্দেশে নেত্রকোণার বাবু চন্দ্রকুমার দে সংগ্রহ করেন মৈমনসিংহ গীতিকার বিভিন্ন পালা, যা লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে পরিগণিত। বাংলা লোকসাহিত্যের একটি অংশ হলো বাউলগান। বাউলগান মূলত বাউল সম্প্রদায়ের রচিত ও গীত গান। বাউলেরা উদার ও অসাম্প্রদায়িক সাধক। তাঁরা মানবতার বাণী প্রচার করেন। বাউলগানে বৈষ্ণবধর্ম এবং সুফিবাদের প্রভাব লক্ষ করা যায়। লালন ফকির অনুসারী বাউল ও ভাটি অঞ্চলের বাউলদের মধ্যে স্পষ্টতই কিছু ভিন্নতা আছে। প্রকৃতপক্ষে লালন সাঁইজির অনুসারীরা ধর্মে বাউল। তাঁরা স্বতন্ত্র একটা দর্শন লালন করেন। সাঁইজির পদ ছাড়া নতুন কোনো পদ রচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না, সাঁইজির পদই গেয়ে যান পরম্পরায়। তাঁরা সাধারণত সংসারী নয়। অপরদিকে ভাটির বাউলরা গুরুর পদ যেমন গায়, সেই সঙ্গে নিজেরাও নতুন পদ সৃষ্টিতে সচেষ্ট হন। সংসার এবং গান চলে সমান্তরালভাবে। বাউলগান বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট তথা সমগ্র বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। বৃহত্তর ময়মনসিংহে বাউলগানকে 'বাউলা' গান বলে। এখানে হাওরের লিলুয়া বাতাস এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষের মনকে উদাস করে। একসময় এখানকার মানুষের গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ ছিল, সবমিলিয়ে অভাব-অনটন তাঁদের স্পর্শ করতে পারেনি। সারাদিন পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় তাঁরা গান-বাজনা নিয়ে মেতে উঠত। আসলে এখানকার প্রকৃতি মানুষকে ভাবুক হিসেবে তৈরি করে। তাইতো এ অঞ্চলে অনেক কবি- সাহিত্যিকের জন্ম।
ভাটিবাংলার লোকগানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন বাউলকবি রশিদ উদ্দিন। নেত্রকোণা শহরের উপকণ্ঠে বাহিরচাপড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাউলকবি রশিদ উদ্দিন। বড় ভাই এন্ট্রান্স পাস করে কেরানির চাকরি দিয়ে জীবন শুরু করলেও রশিদ উদ্দিন ছিলেন উদাসীন প্রকৃতির মানুষ, স্কুল তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি, বড় ভাইয়ের নিকট প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করলেও তাঁর আর লেখাপড়া হয়ে উঠেনি।
১৯৩৩ সালের ডিসেম্বর মাসে নেত্রকোণা শহরের গরহাট্টায় প্রথম তত্ত্বভিত্তিক এবং তর্কভিত্তিক মালজোড়া বাউলগানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এর আগে বাউলগান বৈঠকি আসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কালক্রমে সেই তত্ত্বভিত্তিক এবং প্রশ্নোত্তরভিত্তিক বাউলগানের নামই মালজোড়া গান হিসেবে প্রচলন করেন বাউলকবি রশিদ উদ্দিন। যার জন্য বাউল রশিদ উদ্দিনকে মালজোড়া গানের প্রবর্তক বলা হয়। রশিদ উদ্দিনের জীবন ছিল বড়োই বিচিত্র। গানই তাঁর একমাত্র সাধনা ছিল। তিনি একসময় সৃষ্টিরহস্য খুঁজতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে চলে যান শারফিনের মাজারে। তাঁর প্রধান শিষ্য ছিলেন আরেক কিংবদন্তি লোককবি জালাল উদ্দীন খাঁ। তিনি তাঁকে শারফিনের মাজার থেকে ফানাফিল্লা অবস্থায় আবিষ্কার করেন। রশিদ উদ্দিন ততদিনে মানবদেহ, প্রকৃতি, সৃষ্টিরহস্য, গুরুসাধন, নিগূঢ়তত্ত্ব, আত্মা-পরমাত্মা চিন্তায় পাগলপ্রায়। জালাল খাঁ তাঁকে সঙ্গে নিয়ে বালুয়াখালী ফিরে আসেন। সেই সময় তিনি ভাত না খেয়ে শুধু দুধ ও রুটি খেতেন। হঠাৎ একদিন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী থেকে আগত এক ল্যাংটা ফকিরের আবির্ভাব ঘটে এবং ১৯০৯ সালে তিনি তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তাঁর মধ্যে ভীষণ পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি নিয়মিত গানের আসর বসাতেন। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে উপস্থিত থাকতেন সিংহেরগাঁওয়ের জালাল খাঁ, তেলসিন্দুরের অন্ধ তৈয়ব আলী, অভয়পাশার মিরাজ আলী, বুড়িজুরির আলী হোসেন সরকার, কেন্দুয়ার মজিদ তালুকদার, সিলেটের শাহ আবদুল করিম এবং সহযোগী হিসেবে থাকতেন খালিয়াজুরির বাউলসাধক উকিল মুনশি। এঁরা প্রত্যেকে প্রথিতযশা বাউলকবি।
