হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার বামৈ গ্রামের সাধক শেখ ভানুর 'নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা' শীর্ষক গানটির তিন-তিনটি পাঠান্তর পাওয়া যায়। যদিও শেখ ভানু, রাধারমণ দত্ত ও জসীম উদ্দীনের রচিত হিসেবে প্রচলিত এ তিনটি গানের পঙ্ক্তিতে বেশ পরিবর্তন রয়েছে। নানা মতানৈক্য সত্ত্বেও গবেষকদের ধারণা, শেখ ভানু রচিত গানটিই আদিতম ।
শেখ ভানু রচিত 'নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা' গানটিতে বাউল মতবাদের গুহ্য সাধনতত্ত্ব নিপুণ দক্ষতায় পরিস্ফুট হয়েছে। নারীর রজঃস্রাবের সময় ডাল-পাতা-বৃক্ষ বিহীন যে 'ফুল' যৌনাঙ্গে ভেসে বেড়ায়— তারই ইঙ্গিত গানটিতে রয়েছে। অসাধক ব্যক্তি কখনোই এ ফুলের মর্ম বুঝতে পারে না। 'নয় দরজা' অর্থাৎ শরীরে বাতাস গ্রহণ-বর্জনের নয়টি ছিদ্র বন্ধ করে একজন সাধককে এই ফুলের নির্যাসটুকু গ্রহণ করতে হয়।
বাউল-দর্শনের অন্তর্নিহিত ও গূঢ় তাৎপর্য গানটির পরতে-পরতে লুকিয়ে রয়েছে। নারীসঙ্গকালে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ রাখাটা যে সাধনারই অংশবিশেষ সেটিও প্রকাশ পেয়েছে শেখ ভানুর গানে। পুরো গানটি এ-রকম :
নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা,
শেখ ভানুর উপর্যুক্ত গানটি ছাড়াও সাধনতত্ত্ব-পর্যায়ের আরো বেশকিছু গান রয়েছে। সেসব গানেও একইভাবে বাউল-ফকিরি-চিন্তার প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। পূর্বসূরি সাধকদের মতোই তাঁর অনুভব : 'একে আমার ভাঙা তরি, কেমনে ধরিমু পাড়ি'। এই 'ভাঙা তরি' নিয়ে জাগতিক মায়া-মোহ-সংসার ছিন্ন করে কীভাবে ‘ভবসাগর' পাড়ি দিবেন, এ নিয়ে ছিল তাঁর সতত চিন্তা।
একইভাবে ‘কামনদী'র উত্তাল স্রোতের আঘাতে সুদক্ষ মাঝির ন্যায় নিজ-তরি নিয়ন্ত্রণে রেখে পারে ওঠার জন্য মুর্শিদের সাহায্যের তীব্র আকুলতা ছিল তাঁর গানে। মুর্শিদ নির্দেশিত পথের সন্ধান লাভের ব্যাকুলতা তাঁর পুরো সত্তাজুড়ে প্রবাহিত ছিল। ‘চাতকিনী পাখির মতো' তিনি মুর্শিদের পদধূলি পাওয়ার আশা ব্যক্ত করে জানিয়েছেন : “আমি তোমার চরণের অধীন, ও সোনার মুর্শিদ/মৌলাজি তোমার আশায় আশায় আমার গেল দিন'।
শেখ ভানুর পূর্বসূরি অপরাপর বাউল-ফকির সাধকদের দৃষ্টিভঙ্গির মতো তাঁরও বিশ্বাস, সাধনপথে মুর্শিদ-নাম ভরসা করে চলতে হয়। মুর্শিদ নির্দেশিত বাক্য স্মরণে রেখে পথ চললে 'ভবযন্ত্রণা' থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব। তাই ভানুর আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ—‘মুর্শিদের টিকেট ছাড়া হবে রে তুই পন্থহারা'।
দেহতত্ত্ব পর্যায়ের একাধিক গান রচনা করেছেন শেখ ভানু। বিষয়- বৈচিত্র্যে অপরাপর বাউল-ফকিরের সঙ্গে তাঁর দেহতত্ত্ব পর্যায়ের গানের বিস্তর কোনো ফারাক নেই। সাধকেরা যে ‘মানব-তরির সৃষ্টি- বিন্যাস নিয়ে তাঁদের গানে তাত্ত্বিক পর্যালোচনা করে থাকেন, সেটার অনুকরণই শেখ ভানুর লেখনীতে দৃশ্যমান। তাঁর রচিত 'বিনা কাষ্ঠে, বিনা লোহায়/নাও বানাইছে চৌদ্দ পোয়া’, ‘বিনা তৈলের বাতি জ্বলে ঐ নায়ে' শীর্ষক পঙ্ক্তিগুলো মানব-সৃষ্টির রহস্যকেই প্রত্যক্ষভাবে ইঙ্গিত করেছে।
পিঞ্জিরারূপী যে মানব-শরীরের সৃষ্টি হয়েছে, একদিন সেই পিঞ্জিরাও খালি হবে। পিঞ্জিরা ছেড়ে আত্মারূপী 'মনপাখি' উড়ে গেলে প্রাণহীণ খাঁচা অমূল্য হয়ে পড়বে। মানুষের জন্ম-মৃত্যুর এই চিরায়ত সত্যও ধারণ করে রেখেছে শেখ ভানুর গান : 'মন কই যাও রে কে নিল ধরিয়া / সোনার পিঞ্জিরা রইল জমিনে পড়িয়া/ও মন কই যাও
