বাংলা সাহিত্য-সংগীতের প্রায় সবক্ষেত্রে কাজ করেছি বলে আনন্দবোধ করতাম। কিন্তু সংগীতের স্বরলিপির কাজটি বাকিই ছিলো। দুর্বোধ্য, জটিল- শ্রমসাধ্য অথচ সংগীতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কাজটি শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন করতে পেরে অত্যন্ত সুখবোধ করছি।
কেবল যে স্বরলিপি প্রণয়ন তাই নয়, গ্রন্থ ভেদে পাঠান্তর, পিপাসুদের জন্য প্রয়োজনীয় শব্দার্থ-টিকা, রাগ-তাল-বিষয়সহ সাংগীতিক ব্যাখ্যা গ্রন্থটিকে অনন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। একেক জন্য শিল্পী একেক রকম বাণী ও সুরে গান করেছেন বলে প্রচলিত সুরটি আমরা অনুসরণ করেছি। যাঁদের কণ্ঠের গান অবলম্বনে স্বরলিপি করা হয়েছে পরিশিষ্টে তাঁদের একটি তালিকা দিয়েছি। শব্দার্থ-টিকা-তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত গ্রন্থের তালিকাও আছে। বাণী-পাঠান্তরের জন্য আছে একাধিক গ্রন্থের নাম।
সাঁইজীর গান পছন্দ করেন না, দুনিয়া জুড়ে এমন মানুষ পাওয়া ভার। তাই কাজটি সম্পর্কে যারা অবগত হয়েছেন তারাই প্রশংসা করেছেন।
যেমন ভাবেই হোক গ্রন্থটি সাহিত্যের কল্যাণে, সংগীতের কল্যাণে সর্বোপরি মানুষের কল্যাণে আসলেই আমার সংসার বৈরাগ্য মন ভরে উঠবে। ফকির লালন শাহ্ তো বলেছেন 'মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।'
স্বরলিপি। স্বর + লিপি = স্বরলিপি। সুরকে সংগীতের স্বর দ্বারা লিপিবদ্ধ করাই হলো স্বরলিপি। সাথে থাকবে সাংগীতিক অলংকার ও সাংকেতিক চিহ্ন। স্বরলিপিতে গানের সুরের পাশাপাশি বাণী, তাল, মাত্রা ও ছন্দ একসাথে লিপিবদ্ধ হয়। স্বরলিপি হলো সংগীতকে লিখিতভাবে বিধৃত করার পদ্ধতি। এভাবেও বলা যেতে পারে, স্বর সমূহ ও কতগুলি চিহ্নের সাহায্যে সংগীতকে লিপিবদ্ধ করাকে স্বরলিপি বলে। আক্ষরিক অর্থে গানের সুর লিপিবদ্ধ করে ভাষায় প্রকাশ করা হলো স্বরলিপি। এক কথায়, সুরকে লিপিবদ্ধ করার পদ্ধতিকে বলা হয় স্বরলিপি। প্রসঙ্গত মনে রাখতে হবে, কন্ঠ সংগীতের স্থলে স্বর, তাল চিহ্ন ও কথা এবং যন্ত্র সংগীতের স্থলে স্বর, বিভিন্ন যন্ত্রের সাংকেতিক শব্দ ও তার চিহ্নের সাহায্যে স্বরলিপি করা হয়ে থাকে। ডা. বিমল রায় তাঁর 'সংগীতি শব্দকোষ' গ্রন্থে বলেছেন-
'স্বরলিপি হচ্ছে; স্বর নাম, স্বরের প্রকার, অলঙ্করণ, মাত্রা বিন্যাস, তাল বিভাগ, সুরের উত্থান-পতন, প্রাবল্য-মৃদুতা, গতি-গতিহীনতা, প্রারম্ভ-শেষ, ভুক বা ধাতুর বৈচিত্র, তুকান্তর অর্থাৎ অন্য তুক্ গ্রহণ প্রভৃতিকে প্রতীক ও সংকেত মাধ্যমে যথাযথভাবে বুঝাইয়া এবং যথাস্থানে সন্নিবেশ করিয়া কোনও সুর বা গানের বাহ্য অবয়ব লিপির সাহায্যে রূপায়িত করা।
সংগীতের সুরকে নানা প্রতীক বা চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করার প্রচেষ্টা সেই বৈদিক যুগ থেকে পরিলক্ষিত হয়। তখন বেদমন্ত্রের উপরে নিচে বিভিন্ন চিহ্নের মাধ্যমে সুর নির্দেশ থাকত ।
খ্রিস্ট জন্মের ৩০০০ বছর পূর্বে প্রাচীন যুগের সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত ভারত বর্ষের বিভিন্ন যুগে সাহিত্য, শিল্প ও স্থাপত্যের সাথে সাথে সংগীত কলাও যথেষ্ট উৎকর্ষ লাভ করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে স্বরলিপির প্রবর্তন না হওয়ার দরুণ আমরা সংগীতে তৎকালীন অমূল্যরাজি থেকে চিরতরে বঞ্চিত হয়েছি। বৈদিকযুগে (খ্রি.পূ.২০০০) সামবেদ কীভাবে গাওয়া হত, অমর গায়ক ও রাগশিল্পী তানসেন এবং তাঁর পূর্ব ও পরবর্তীকালে সুবিখ্যাত গায়ক-বাদকরা কী স্বতন্ত্র প্রণালীতে গান বাজনা করতেন এবং তানসেনের সমসাময়িক কালের বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ কীর্তনের প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে আমাদের নিকট কোন প্রত্যক্ষ প্রকাশ নাই। স্বরলিপির
