বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের তীক্ষ্ণধী-তাত্ত্বিক বাউল-পদকর্তা গান তাঁর স্বাতন্ত্র্যকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
জারা লালনের গানে যে-রকম নিগূঢ়তত্ত্বের ছাপ পাওয়া যায়, তেমনি জালালের গানেও একইরকম তত্ত্বই প্রতিফলিত হয়েছে। - তার ঐতিহ্য ধারণ করে জালাল তাঁর রচিত গানগুলো নানা তত্ত্বনামে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে আত্মতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব, নিযুতত্ত্ব, সাধনতত্ত্ব উল্লেখযোগ্য। এর বাইরেও তাঁর রচিত বেশকিছু বিষেশ ও গণসংগীত পর্যায়ের গান রয়েছে; সেসব গানেও জালালের ীতাवণী।
আবহমান কালের লোকায়ত বাউল-দর্শনের সার্থক উত্তরসূরি জালাল উদ্দীন । তাঁর স্বজেলা নেত্রকোনার পূর্বসূরি বাউলসাধক রশিদ উদ্দিন, উকিল মুনশি, মান পাঠান, দীন শরৎ-দের সহযাত্রী হয়ে বাউল-মতবাদের ধারাটিকে আজীবন সজীব ও প্রাণবন্ত রেখেছেন। তবে তাঁদের সহযাত্রী হিসেবে থেকেও যেন তিনি একটু- আলাদা, একটু ব্যতিক্রম। সেটা কেবল জালালের জীবনাচার ও দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই নয়, তা তাঁর সরস পদাবলি রচনার জন্যও বটে।
জালালের গানের গাঁধুনি ও কাব্যভাবনা বাউল-দর্শন চর্চার এক অপূর্ব নজির বলা যেতে পারে।
জালাল উদ্দীন খাঁর জীবন-কাহিনিও কিন্তু কম আকর্ষণীয় নয়। তাঁর সম্পর্কে কিছু লোকশ্রুতিও প্রচলিত রয়েছে। তাঁর অষ্টম পূর্বপুরুষ ছিলেন হিন্দু ব্রাহ্মণ, তাঁর স্ত্রীর সংখ্যা ছিল অন্তত দেড় ডজন'। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যায় জালাল-জীবনীকার আজিজুল হক চৌধুরীর বয়ানে। তিনি জানিয়েছিলেন, জালাল মারা যাওয়ার পর যথারীতি ইসলামি রেওয়াজ অনুযায়ী তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে পিতাকে বাড়ি
থেকে কিছুটা দূরে একটি রাস্তার পাশে দাফন করেন। জালালের মৃত্যুর পর দেশের নানা প্রান্ত থেকে তাঁর হাজারো শিষ্য-অনুরাগীরা ভিড় জমাতে শুরু করেন। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পরও এসব শিষ্যের দাবি—জালালকে নিজ বাড়ির আঙিনায় আমগাছের নিচে পুনরায় কবর দিতে হবে। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এটি একেবারেই শরিয়তবিরোধী জানিয়ে জালালের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবির বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়। কিন্তু শিষ্য-অনুরাগীরা তাঁদের দাবির পক্ষে অনড় থাকেন। ধীরে ধীরে 'নেংটিপরা জটাধারী' সাধকদের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। এভাবে চারদিন কেটে যাওয়ার পর পঞ্চম দিন বিক্ষুব্ধ জালাল-অনুসারীরা গুরুর মরদেহ কবর থেকে তুলে বাড়ির আঙিনায় জালালের সাধনার বৈঠকখানার পাশের আমগাছের নিচে সমাধিস্থ করেন।
উপর্যুক্ত ঘটনাটি জালালের ভক্ত-অনুসারীদের আবেগকেই চিহ্নিত করে। তবে এও ঠিক যে, জালালের যেমন এ-ধরনের অসংখ্য শিষ্য- ভক্ত রয়েছে, তেমনি তাঁর মতবাদবিরোধী মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তবে জালাল কখনোই তাঁর প্রতিপক্ষের আস্ফালনকে আমল দেননি। বরং সমাজের নিম্নবর্ণের হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে 'নয়া মানবতাবাদ' প্রতিষ্ঠায় সতত সচেষ্ট ছিলেন। শরিয়তপন্থী আলেমেরা জালালকে নানা অপবাদের মাধ্যমে তাঁর দর্শন-মতবাদের বিকাশ ও প্রসারে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চালালেও তাতে সফলতা আসেনি।
একজন বাউলসাধক হিসেবে জালাল উদ্দীন খাঁর পরিচিতি ভারতবর্ষের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে সমভাবে পরিচিত ছিল। যোগাযোগ-দূরূহতা সত্ত্বেও তখনকার নাগরিক ও সুশীল সমাজের
সঙ্গে জালালের বন্ধুত্ব তাঁর গানের প্রচার ও প্রসারে নবমাত্রা পেয়েছিল। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের জয়দেবের কেন্দুলির বাউলদের বার্ষিক মেলায় যোগদানের আহ্বান জানিয়ে জালালের কাছে কলকাতার পূর্ণেন্দুপ্রসাদ ভট্টাচার্যের চিঠি কিংবা সুরকার-শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের সঙ্গে পত্রযোগাযোগ উপর্যুক্ত কথার স্বপক্ষে প্রামাণ্য-নথি হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া যায়। এছাড়া বাউল-গবেষক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনের সঙ্গে তাঁর সখ্যও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে।
জালাল উদ্দীন খাঁ তাঁর পূর্বসূরি লালনের গানের ‘আট কুঠুরি নয় দরোজা' পক্তির যথোপযুক্ত বাস্তবায়ন ঘটিয়েছেন তাঁর সাধনকক্ষ নির্মাণকালে। জালাল লালনের সেই গানের শারীরিক আদলে আট কোণা ও চালবিশিষ্ট এবং নয়টি দরজা-জানালার সমন্বয়ে সাধন-
