লালনের জাত-ধর্ম নিয়ে বিতর্ক-কৌতূহল-আগ্রহ গত কয়েক দশকের ব্যবধানে বেশ জমে উঠেছে। এতে করে তাঁর গানের ভাব ও শিল্পমূল্য নির্ধারণের চেয়ে ব্যক্তিলালনের আচার গুপ্তসাধনাই মূলত প্রাধান্য পাচ্ছে। জন্ম-মৃত্যু-জাত-ধর্ম নিয়ে ধূসরতা ও সংশয় থেকে গেলেও লালনের গান ঘাঁটলে তাঁর দর্শন সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা পরিস্ফুষ্ট হয়। জাত নিয়ে গবেষকদের নানা মতান্তর-বাহাস প্রায়শই বিভিন্ন বই-পুস্তক-সাময়িকীতে চোখে পড়ে। দীর্ঘকাল ধরে এমনটা চলতে- চলতে বছর দুয়েকের মধ্যে সেটাও থিতু হয়ে পড়েছে। এখন চলছে লালনভাষা অনুসন্ধান এবং তাঁর গানের দর্শনগত ব্যাখ্যা-আলোচনা- বিশ্লেষণ । আর এটাই হওয়া প্রয়োজন এবং প্রাসঙ্গিক।
লালনের গানের অন্তগূঢ় তত্ত্ব হচ্ছে মানুষ ভজনা। অথচ জাত- ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-দেশ-কালের ভিন্নতায় পৃথিবীজুড়ে যুগে যুগে মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-ভেদাভেদ তৈরি হয়ে সাম্প্রদায়িকতা এবং প্রতিক্রিয়াশীলতার উদ্ভবও ওই একই কারণে। আর সেখানটাতেই সোচ্চার ছিলেন লালন সাঁই। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র- জাতির বিদ্বেষ-হিংসার বিপরীতে তাঁর ছিল সুস্পষ্ট উচ্চারণ : 'মানুষের নাই জাতের বিচার/এক এক দেশে এক এক আচার'। আবার এও বলেছিলেন—'যখন তুমি ভবে এলে/তখন তুমি কী জাত ছিলে/যাবার বেলায় কী জাত নিলে/এ-কথা আমায় বলো না ॥' লালন যখন নিজেই জাতপাতকে প্রাধান্য দেননি তাই অন্তত তাঁর ক্ষেত্রে সে সম্পর্কে ঘাঁটাঘাঁটি অবান্তরই বলা যেতে পারে।
মানুষের মধ্যেই সৃষ্টিকর্তা—এটাই লালন দর্শনের অন্যতম প্রধান মতবাদ। তবে এ সৃষ্টিকর্তার সন্ধান পেতে হলে আগে নিজের স্বরূপ ভালোভাবে অনুসন্ধান করতে হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর
মতবাদ অনুযায়ী, 'আপন খবর না যদি হয়।/যার অন্ত নাই তার অন্ত কিসে পাই ॥' নিজের দেহের মধ্যে 'সাঁইর বারামখানা' রয়েছে উল্লেখ করে লালন জানাচ্ছেন, দেহভাণ্ডে 'অরূপরতন' কিংবা 'পরমেশ্বর'-এর সন্ধান পাওয়ার জন্য গুরু ভজতে হবে। গুরু না-ধরলে 'আত্মা আর পরমআত্মা'র ভেদাভেদ কিংবা 'আন্ততত্ত্ব' জানা সম্ভব নয়। আর 'আপ্ততত্ত্ব' না-জানলে ভজনও হবে না।
সঠিকভাবে ভজন না-হলে 'পারে' যাওয়া অসম্ভব। আর 'পারে' না-যাওয়া মানেই পুরো সাধনজীবন বৃথা। এতে করে একজন সাধকের পতন ঘটে। পতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে একজন সাধককে কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে জীবন অতিক্রম করতে হয়। ব্যবহারিক জীবনাচার, করণ-কারণ, বস্তু নিয়ন্ত্রণ ও নানাবিধি বন্ধুর পথের ন্যায় সাধককে বারংবার বাধাগ্রস্ত করে। আর এসব বাধা ঠেলে গুরু-নির্দেশিত পথে সাধক উজান পথে তরি বাইতে থাকেন। তবে 'কামসাগর'-এর মায়াবী ঢেউয়ের উতরোলে প্রতিনিয়ত তরি ডুবে যাওয়ার আশংকাও তৈরি হয়।
'কামসাগর'-এ অধিকাংশ সাধকের তরি ডুবে যাওয়ার নজিরও রয়েছে। এক্ষেত্রে যাঁরা সুদক্ষ-মাঝি, তারা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে “কামকুন্ডীর'-কে বশে এনে কামমোহ বন্ধন থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। এমনটা হলেই তিনি সার্থক ও সফল সাধক হিসেবে বাউল- ফকির সমাজে পরিগণিত হন।
লালন তাঁর একাধিক গানে কামকে নিয়ন্ত্রণে রাখার উপর সাধকদের প্রতি জোরারোপ করেছেন। গুরু প্রদত্ত নিজের দেহে 'বিন্দুরূপী' যে 'বস্তু' রয়েছে, সেটার ক্ষয় যেন না হয় সেক্ষেত্রেও খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ যখনই এই 'বন্ধু'রূপী 'বিন্দু'-র ক্ষয় হবে তখন থেকেই সাধকের পতনকাল হিসেবে গণ্য করা হবে। তাই যে সাধক যত বেশি শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে "বস্তু" ধরে রাখার ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারবেন, তিনিই বড়ো সাধক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবেন। এক্ষেত্রে লালনের সাবধান বাণী "মায়াতে মত্ত হলে/শুরুর চরণ না চিনিলে/সত্য পথ হারাইলে/খোয়ালে
. মহতের সঙ্গ ধরো/কামের ঘরে কপাট মারো/পালন
শুনে সে রূপ দরশনে/পাবি রে পরশ রতন
লালনের এ বাণী রয়েছে একাধিক গানে। বলছেন- 'কত কর মহাশয়/সেই নদীতে মারা যায়'। 'মহাশয়' 'সাধক'। অর্থাৎ সেই সাধকেরা নারীদেহে মের সময় পতন
