ভূমিকা
বিশ্বপ্রসিদ্ধ সুফিতাত্ত্বিক ও মুসলিম চিন্তাজগতের আলোড়ন সৃষ্টিকারী দার্শনিক শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী এবং তাঁর ছাত্রদের বৈদ্যুতিক প্রভাব হিজরি নবম শতাব্দীতে মুসলিম বিশ্বে তীব্র ও বেগবান স্রোতের ন্যায় বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। এ সময় ইলমে তাসাওউফ একটি দর্শনে পরিণত হয় যেখানে গ্রীক অধিবিদ্যার বহু পরিভাষা ও বিষয়গত দিক অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। 'ওয়াহদাতুল ওজুদ' তাসাওউফ পন্থীদের প্রতীক চিহ্ন ও গর্বের বস্তুতে পরিণত হয় এবং খানকাহ থেকে শুরু করে মাদরাসা অবধি সর্বত্র এর জয়গান গী ধ্বনিত হয়ে থাকে। পূর্ববর্তী সুফিদের সকল ঘোষণা ও পরম সত্যের একত্ববোধক সাক্ষ্যকে শৃঙ্খলিত ও বিধিবদ্ধ করে মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী তৌহিদে ওজুদীয়া ধারার প্রবর্তন করেন এবং তা 'ওয়াহদাতুল ওজুদ' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। বলা যায় সকল সুফিদের সাক্ষ্যের মাঝেই এ ধারার চর্চা অব্যাহত ছিল কিন্তু তাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে বিধিবন্ধ আইনে পরিণত করার রূপকার হলেন ইবনুল আরাবী। তাই সকল যুগের সুফিদের মুখ থেকে 'ওয়াহদাতুল ওজুদের' পরিচয় পাওয়া যায়। যারা আল্লাহ-প্রেমে আত্মবিভোল হতেন, এমন সব উক্তি প্রকাশিত হয়েছে যা দ্বারা 'ওয়াহদাতুল ওজুদ' মতবাদ
শায়খুল আকবর তাঁর যুগের বিখ্যাত পণ্ডিত এবং শ্রেষ্ঠ সুফি ছিলেন। তিনি নিভলুষ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি পিতার কাছেই শৈশব ও কৈশোরে তাসাওউফের দীক্ষা লাভ করেন। তিনি গদ্য ও পদ্য উভয়বিধ রচনাতেই বিশেষ পারদর্শী। তাঁর রচিত দুইশত ১০ খানা পুস্তকের সন্ধান মেলে তন্মধ্যে 'ককুহাত আল-মক্কীয়াহ' ও 'কুসুস-উল-হিকাম' পুস্তকয় জগদ্বিখ্যাত। এই বই দুখানি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে সমগ্র বিশ্বব্যাপি আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।
হযরত ইবনুল আরাবী (রা.)-এর মধ্যেই সর্ব-আল্লাহবাদ ও 'ওয়াহদাতুল ওজুদা পূর্ণতমরূপে বিকাশ লাভ করে। তিনি ওয়াহদাতুল ওজুদ প্রচার করেন হিজরি তৃতীয় শতকে এর প্রবণতা দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে হযরত
বায়েজিদ বোস্তামী (রা.), হযরত মনসুর হাল্লাজা (রা.) প্রমুখের কিছু কিছু উক্তিতে সর্ব-আল্লাহবাদ বা একত্ববাদের (Pantheism) আভাস পাওয়া যায়। তবে হযরত মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবীই পূর্ণরূপে 'ওয়াহদাতুল ওজুদ' মতবাদের জন্মদান করেন। ' ' সর্ব-আল্লাহবাদের মূল কথা হলো, এ বিশ্বজগত আল্লাহর বিকশিত রূপ এবং সেজন্য আল্লাহই সব এবং সবই আল্লাহর প্রকাশ। এ দর্শনের বুনিয়াদ নীতি হলো আল্লাহই সকল সত্তার ঐক্য। আল্লাহ ব্যতীত দ্বিতীয় কোন সত্তা নেই। সৃষ্টিকে আলাদা সত্তা হিসাবে ধরলে দুটি সত্তার সত্যতা স্বীকার করতে হয়। কাজেই হযরত ইবনুল আরাবী (রা.) সৃষ্টিকে আল্লাহর প্রকাশ হিসাবে ধরেছেন এবং দ্বিতীয় কোন সপ্তার সম্ভাবনাকে নির্মূল করতে প্রয়াস পেয়েছেন। বলা বাহুল্য, ইবনুল আরাবী (রা.)- পর কোন সুফি সাধকই তাঁর এই চিন্তাধারার প্রভাব এড়িয়ে চলতে সমর্থ হননি। কম-বেশি সবাই এই মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।
তিনি ২৯ জুলাই ১১৬৫ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৫৬০ হিজরিতে সুফি মতবাদের প্রতি অনুরক্ত স্পেনের আত্মসন্ধানী এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১২৪৩ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৬৩৮ হিজরির ২৮ রবিউসসানি জুম্মারাতে প্রাণত্যাগ করেন। তাঁর নশ্বর দেহাবশেষ কাসিয়ুন পাহাড়ের পাদদেশে 'আল কিবরিত আল আহমার' নামক স্থানে সমাহিত হয়। এই স্থানটি সুফিদের নিকট অতি পবিত্র। তাঁর পিতা একজন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও ধনী ব্যক্তি ছিলেন। বাল্যকালে তিনি তাঁর পিতার নিকট শিক্ষা লাভ করেন এবং অসাধারণ মেধাশক্তির অধিকারী ছিলেন। তিনি উচ্চ শিক্ষালাভের জন্য সেতীলে গমন করেন এবং আরবী ভাষাসহ পবিত্র কোরআন, হাদিস, ফিকাহ, ইলমূল- কালাম, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, তর্কশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি বহু কবিতা রচনা করে একজন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হিসাবে খ্যাতিলাভ করেন এবং সুফি প্রভাবের ফলে বাল্যকাল হতে অতিশয় ধর্মপরায়ণ ছিলেন। সত্যানুসন্ধানী ও ঐশী জ্ঞানে জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাহচর্য লাভের পর হতে তাঁর মনে সত্যের স্বরূপ উদ্ঘাটনের প্রবল ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা জানো। কিশোর অবস্থা হতে তাঁর মধ্যে পয়গঘরের লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং তাঁর কাছে স্বপ্নে ইসমে আযম' বা শ্রেষ্ঠ নাম-এর প্রকাশ পায়। তিনি ৫৭৯ হিজরিতে কিউটা গমন করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে একটি স্বপ্ন দেখেন। এই স্বপ্নে তিনি সকল নক্ষত্র ও চন্দ্রকে বিয়ে করেন। একজন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও গণক ব্যক্তি তাঁর এই স্বপ্নের কথা শুনে বলেন যে স্বপ্নদ্রষ্টা অসামান্য সৌভাগ্যবান, সকল জ্ঞানের জ্ঞানী ও সর্বশ্রেষ্ঠ অপ্রতিদ্বন্দ্বী চিন্তানায়ক হিসেবে আবির্ভূত হবেন।
সুফি সাধনায় তিনি এত উন্নত স্তরে উন্নীত হন যে তাঁর ভক্তরা তাঁকে শায়খুল 'আকবর' বা শ্রেষ্ঠ শাষণ উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা
