ভূমিকা
নিজের স্বরূপকে চেনা ও জানা হলে পরমাত্মাকে জানা যায়। কোরআনিক সুফি রহস্যের মূল ভিত্তি আত্মদর্শন। আল কোরআন সকল প্রকার সুপ্ত, গুপ্ত, ব্যক্ত অব্যক্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার। এখানে যাবতীয় বিষয়ের জ্ঞান লুক্কায়িত আছে। ইলমে মারেফত ও ইলমে শরিয়তসহ সকল প্রকার জ্ঞানের মূলভিত্তি আল কোরআন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- অমা মিন দ্বাব্বাাতিন ফিচ্ছামাই অল আরদ্বি ইন্না ফী কিতাবিম মুবীন।-সুরা নমল : ৭৫
অর্থ : আকাশ এবং পৃথিবীতে এমন কোনো গোপন ভেদ নেই, যা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়নি।
কোরআনের বহু আয়াতে সুফি রহস্য সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে- *ওয়া ফী আনফুসিকুম আফালা তুছিরুন।'
‘হে বান্দাগণ! আমি তোমাদের আত্মার সাথে আছি, তোমরা কী দেখ না!
--সূরা-যারিয়াত, আয়াত-২১ অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ওয়ামা রামাইতা ইয রামাইতা ওয়ালা কিন্নাল্লাহা রামা অর্থাৎ [হে মুহম্মদ (সা.)!] যখন তুমি শত্রুদের প্রতি ধূলি নিক্ষেপ করেছিলে, তা তুমি করনি, বরং আল্লাহ্ই নিক্ষেপ করেছিলেন।
-সূরা-আনফাল আয়াত-১৭ আমি স্বীয় চিহ্নসমূহ জগতে ও মনুষ্য শরীরে দেখাবার জন্য প্রকাশ করেছি, উদ্দেশ্য এই যে, সত্যের অবস্থা যেন তাদের নিকট প্রকাশিত হয়।
-সূরা হা-মিম-সিজদা-আয়াত-৫৩ যখন আমার বান্দারা [হে মুহম্মদ (সা.)!] তোমাকে জিজ্ঞেস করবে যে তোমার আল্লাহ্ কোথায়? তখন বলবে, আল্লাহ্ আমার নিকটেই আছেন।
-সূরা-বাকারা পবিত্র কুরআন শরীফে ইত্যাকার বহুবিধ আয়াত বিদ্যমান, যার মধ্যে তওহীদের মৌলিক রূপ ও সুফি রহস্য ব্যক্ত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ঐসব তত্ত্বপূর্ণ ও সুফিতাত্ত্বি বাণীসমূহ মুসলিম অন্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল এবং সেজন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বতস্ফূর্তভাবেই ইসলামে তাসাউফের উন্মেষ ঘটে। যাকে আমরা কোরআনিক সুফি রহস্য বলে আখ্যায়িত করতে পারি। পবিত্র কোরআনের এসব আয়াতের সারমর্ম মতে আমাদের পেয়ারা নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন ইসলামের প্রথম সুফি। তাঁর পবিত্র নূর থেকেই সৃষ্টির সূচনা ও বিকাশ।
কোরআনিক সুফি রহস্য তথা ইলমে তাসাউফ শিক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আল্লাহর মহান ঘোষণা রয়েছে,
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, লিকুল্লি উম্মাতিন জাআলনা মিনকুম শিরআতাও ওয়া মিনহাজা
অর্থাৎ 'তোমাদের প্রত্যেক জাতির জন্যই আমি একটি শরীয়ত এবং অপরটি তরীকত ব্যবস্থা দান করেছি।'
‘মিনহাজ' শব্দ দিয়ে ইলমে তরীকত, ইলমে তাসাউফ, ইলমে বাতিন, ইলমে গায়িবের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে।
অনুরূপভাবে ভিন্ন অপর এক আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে, ওয়াবতাও ইলাইহে ওয়াসিলাতা অর্থাৎ, ‘আমার কাছে পৌঁছাতে তোমরা উসিলা অন্বেষণ কর।' হযরত ইব্রাহীম (আ.) নিজপুত্র ইসমাইল (আ.) কে সাথে নিয়ে কাবাঘর সংস্কার করার পর এ বলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানালেন যে,
'রব্বানা ওয়াবআস ফিহিম রাসূলা মিনহুম ইয়াতলু আলাইহিম আইয়াতিকা ওয়াইউ আল্লিমুহুমুল কিতাবা ওয়াল হিকমাতা ওয়াইউ ঝাক্কিহিম ইন্নাকা আনতাল আঝিঝুল হাকিম।'
অর্থাৎ 'হে মহান রব! কাবাবাসীদের থেকেই আপনি একজন রসুল প্রেরণ করুন, যিনি আপনার আয়াতগুলো তাদেরকে পাঠ করে শোনাবেন এবং নাযিল হওয়া গ্রন্থের বিষয়বস্তু ও তৎসম্পর্কিত জ্ঞান-বিজ্ঞান তাদের শিক্ষা দেবেন এবং এগুলো দিয়ে তাদেরকে পবিত্র করে তুলবেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রবল পরাক্রান্ত বিজ্ঞানময়।
-সূরা আল-বারাকা, আয়াত ১২৯ সুতরাং প্রথম আয়াতে “মিনহাজ (তরীকত) দ্বিতীয় আয়াতে ‘উসিলা’ এবং তৃতীয় আয়াতে ইউযাক্কীহিম' (পবিত্রকরণ বা পুত্র-পবিত্র করে তোলে) এ শব্দগুলো নিয়ে তাসাউফ শিক্ষার আবশ্যকতা একটি অপরিহার্য বিষয় বলে বিবেচিত হয়েছে। কারণ তাসাউফ শিক্ষা বাদে অন্ধত্ব দূর হয় না, আত্মপরিচয় লাভ হয় না, স্রষ্টা ও সৃষ্টি সম্পর্কে জানা যায় না, কু চরিত্র দূর হয় না, নৈতিক চরিত্রের উন্নতি ঘটে না, আত্মোন্নতির সুযোগ ঘটে না, 'মালাইকা' (ফেরেশতা) চরিত্রে উন্নীত হওয়া যায় না, সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। সেজন্য আল্লাহপাক কোরআনের বহু আয়াতে কারীমায় সুফি রহস্য ব্যক্ত করেছেন, যাতে ইলমে তাসাউফ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
আয়াতে হযরত ইব্রাহীম (আ.) মক্কাবাসীদের মধ্য থেকে যেই রসুল প্রেরণের জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন, সেই রাসুলের ওপর তিনি চারটি দায়িত্ব পালনের কথাও উল্লেখ করেছেন। যেমন-
১. আসমানী গ্রন্থের আয়াতসমূহ তাদের পাঠ করে শোনাবেন। অর্থাৎ নাযিলকৃত আয়াতগুলোর বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাদেরকে অবগত করবেন।
২. অবতীর্ণ কিতাবটি তিনি তাদেরকে হাতে কলমে শিক্ষা দেবেন। ৩. তিনি সেই লোকদের বিজ্ঞানসম্মত বিষয়ও শিক্ষা দিবেন।
৪. তিনি ঐ সমস্ত লোকদের ও আত্মিক পবিত্রকরণ পদ্ধতি শিক্ষা দিবেন।
T
নর
বর্ণিত আয়াতের শেষে উল্লিখিত দুটি দায়িত্বের একটি হলো, হিকমত এবং অপরটি তাযকিয়ায়ে নট্স পদ্ধতি। হিকমত দ্বারা ধর্মীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান তথা ধর্মীয় কলা-কৌশল শিক্ষাদানের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ দেহ ও আত্মা, এই দুইয়ের সংযোগ, সংমিশ্রণ ও সমন্বয়ের ফলই মানব দেহ। এই দুইয়ের সংযোগ সাধনের নামই ধর্মীয় বিজ্ঞান, সুফিদর্শন বা তাসাউফতত্ত্ব। শারীরিক ও মানবিক দায়িত্ববোধ পালনের নামই শরীয়ত। আর আত্মিক কলাকৌশল সম্পর্কে জানার নামই আত্মজ্ঞান ইলমে বাতেন, ইলমে তরীকত, ইলমে তাসাউফ প্রভৃতি নামে নামকরণ করা যায়। সুফিবাদের মতে, আত্মিক উন্নতি, আত্মোন্নতি সাধন, নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয়রোধ অথবা তরীকতের পথে আত্মশুদ্ধি অর্জনের পথ নির্দেশ করে। সে সাথে তিনি তাঁর আত্মশক্তির রেখাপাত ও শাগরিদের আত্মায় ঘটিয়ে থাকেন।
সুতরাং উল্লিখিত আয়াতে বর্ণিত ‘ইউযাক্বীহিম' দ্বারা আত্মশুদ্ধির আবশ্যকতা সম্পর্কে অবহিত করানো হয়েছে। কারণ আত্মশুদ্ধি ব্যতিরেকে কোনো মানবাত্মাই বাঁচতে পারে না। এই আত্মশুদ্ধি অর্জনের পদ্ধতিই তাসাউফ বা সুফি সাধনার শিক্ষা। এই তাসাউফ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাবোধে অনুপ্রাণিত হয়েই একদল সাহাবা জাগতিক মায়ামোহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্যে বাস করতেন। তাঁরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবন উৎসর্গ করে গিয়েছেন। “আসহাবে সুফ্ফাহ' নামে ইসলামের ইতিহাসে তাঁদেরকেই আখ্যায়িত করা হয়েছে। সুফিতত্ত্ব শিক্ষা করাই ছিল তাঁদের মূল উদ্দেশ্যে। তখন থেকেই তাঁরা 'আসহাবে সুফ্ফাহ' নামে খ্যাত হয়ে আসছেন। তখন থেকেই উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে তাসাউফ শিক্ষার প্রতি দারুণ উৎসাহ দেখা দেয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত তাসাউফ চর্চা জারি আছে।
সুফি রহস্য জ্ঞানের প্রতি গুরুত্বারোপ করে তাসাউফ চর্চার প্রয়োজনীয়তা প্রিয় নবিজী (সা.)-এর বাণীর মাঝেই বর্ণিত হয়েছে-
*আশ শরিয়াতো আক ওয়ালী, আত্ তরিকাতো আফওয়ালী
আল হাকিকাতো আহওয়ালী, আল মারেফাতো আসরারী'
সরল তরজমা : শরিয়ত হচ্ছে আমার বাণীসমূহ। তরিকত হচ্ছে আমার কার্যাবলি, হাকিকত হচ্ছে আমার হাল অবস্থাসমূহ, মারেফত হচ্ছে আমার গুপ্ত রহস্য'।-হাদিসে কুদসী
প্রিয় নবিজীর অনুসরণ করতে কোরআনে আল্লাহপাক বিশেষভাবে ঘোষণা
করেছেন-
লাকাদ কানা লাকুম ফী রাসূলিল্লাহি উছওয়াতুল হাসানাহ্ অর্থাৎ তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।
-সুরা- আহযাব, আয়াত-২১
