আমার এই কাজের পেছনে যদি কোনও মূল লক্ষ্য বা মহৎ উদ্দেশ্য থেকে থাকে, তা এন্ড হতে একাধিক। বাংলা ভাষার দুদিনের ইতিহাসটি ও তার দুঃসময়ের সকরুণ কাহিনিটিকে সুদিনের প্রাঙ্গণে একবার তুলে ধরা। নচেৎ বাংলা ভাষার ইতিহাসের অবমূল্যায়ন ও অমর্যাদা বা সুদিনের হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। বিকৃত বা খণ্ডিত ইতিহাস, ইতিহাসই নয়। সাহিত্যের ইতিহাস খণ্ডিত ও পতিতাদের অতীতের ইসলামি বাংলা সাহিত্যের অধুনা বিস্মৃতপ্রায় যে বিশাল ধারাটি একদিন বাংলাভাষার মরা গাঙ্গে বান এনেছিল, বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে বিপুল সংখ্যক জনগণের এম-পিপাসা নিবৃত্ত করেছিল, তা আমাদের দূর ভবিষ্যতের প্রজন্মরা একটু-আধটু জানার সুযোগ পাক। সুদূর অতীতে তাঁদের প্রপিতামহরা কিরূপ সাহিত্য রচনা করতেন, কি ভাবে সাধ্য- আলো জ্বেলে দিয়ে অর্ধেক রাত্রি পর্যন্ত বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনায় দলিজ বাড়ি ও বৈঠকখানা বাড়িতে তা শোনার জন্য সাগ্রহে সকলেই একত্রিত হতেন, বাংলা ভাষা-ভাষি ছেলে-মেয়েদের
সেটা জানা তো দরকার।
বাংলার পুঁথি সাহিত্য একদিন তামাম বাঙ্গালীকে যেভাবে আনন্দদানে সহ-অবস্থানে মৃদ
ও মোহগ্রস্ত করে তুলেছিল, আজও তার কোন তুলনা নাই। সে এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। দিবাবসানে মানুষ পেয়েছিল শান্তি ও স্বস্তি। প্রভাতে পেয়েছিলকর্ম-স্পৃহা। জানি না, কবে আবার কোন সাহিত্যধারায় বঙ্গা-জননী তার সন্তানদের নানা বৈচিত্র্যের মধ্যেও নিবিড় বায়ু-বন্ধনে একটি স্থানে একত্রিত করবে। বঙ্গা জননীর ওই ভালবাসা, ওই শ্রদ্ধা ও স্নেহ, ওই প্রেম ও প্রীতি, ওই রাগ ও অনুরাগের স্পর্শমাখা পরিবেশ যারা একবার দেখেছে, কোন দিনই ভুলবে না, এইটাই তো স্বর্গীয় পরিবেশ। মানুষের জন্য মর্তলোকে এর চেয়ে বড় দান আর কি হতে পারে। এর পেছনে ছিল পুঁথি সাহিত্যের একক মাহাত্ম্য। যে সাহিত্যের মাহাত্ম্য মানুষকে করে মিলনসুখী। সুখে-দুখে মানুষকেই ভাই বলতে শেখায়। পরকে ঘর করে, অপরকে আপন করে, আত্মাকে করে প্রশস্ত, অন্তরকে করে উদার। তা কতই উত্তম সাহিত্য। বাংলার মুসলিম পুঁথি সাহিত্য সেই চির উত্তম সাহিত্য। ইসলামি বাংলা সাহিত্য তারই জননী স্বরূপ।। এইভাবে ইসলামি বাংলা সাহিত্য একদিন জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে গড়ে তুলেছিল একটি শিশির
ধোয়া শান্ত স্নিখ সুন্দর পরিবেশ। তৃতীয়, আগামী প্রজন্ম আরও জানুক। কিভাবে চাষা, চামার, চন্ডাল, মুচি, মেথর ও ইতরের ভাষা, বাংলা ভাষাকে মুসিলম রাজা-বাদশাহগণ সরাসরি একদিনেই বীরের প্রাণ দান করলেন। বর্তমান বাংলা ভাষার যে উন্নতি তা অতীতের মুসলিম বিজয়ের নিকট চিরঋণী। তারা আরও জানুক, কিভাবে সেদিন এই বাংলা ভাষা যাঁদের হাতে নবজন্ম লাভ করল। তিনিই তো সম্রাট হোসেন শাহ। এই নব-জন্মেরই সোনার ফসল ইসলামি বাংলা সাহিত্য। এবং এই ইসলামি বাংলা সাহিত্যই তার আরব ও পারশা হতে আমদানীকৃত বহু সাহিত্য সম্ভার খারা জীর্ণ ও শীর্ণকায় এক-ডেলে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাটিকে বহু শাখা-প্রশাখায় একটি বিশাল মহীরুহতে পরিণত করল। এ কার দান। অগ্রাতবাসী সম্রাট হোসেন শাহ। সুতরাং বাংলা ভাষার উন্নতি মুসলিম বিজয়ের ফল।
চতুর্থ, বাংলাভাষার স্বাধীনতা ও শ্রীবৃদ্ধি সাধনে শুধু তখনকার রাজবাদশাহগণই নন, বর্তমান বিশ্বেও কেবলমাত্র একটি ভাষাকে কেন্দ্র করে যাঁদের দ্বারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে উঠল, তাঁরা তদানিন্ধন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালী মুজাহিদ মুসলমান। তাঁদের ভাষা আন্দোলন চরম সফলতা লাভ করল। বিশ্ব-মানচিত্রে একটি নূতন রাষ্ট্র জন্ম নিল বাংলাদেশ। সেদিনের মুসলমান রাজা বাদশাহ হতে আজকের সাধারণ মুসলমান পর্যন্ত মাতৃভাষা তথা বাংলা ভাষার জন্য জীবন-মরণ পণে যে ত্যাগ ও তিতিক্ষা স্বীকার করলেন বিশ্ব-ভাষা-ইতিহাসে ইহা একটি নজীরবিহীন ঘটনা। আজও পর্যন্ত তা কোন অমুসলিম, কি বাঙালি, কি অবাঙ্গালী কোন সম্প্রদায়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি। বাঙ্গালী মুসলমান বাংলা ভাষার জন্য অকাতরে প্রাণ দিল। অবলীলায় ইজ্জত দিল, তাই বাংলাভাষা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রাণ পেল, ইজ্জত পেল, আব্বু পেল।
পঞ্চম, আজ সারা বিশ্বজুড়ে, যত মানুষ বাঙ্গলা ভাষায় কথা বলছেন, সেখানে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠের মর্যাদা লাভ করেছেন। (যদিও এখনও কানে পড়ে, মুসলমানরা কি বাংলায় কথা বলে। এই সংখ্যা গরিষ্ঠের দল বর্তমানেও বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধিসাধনে এবং ইসালমি চিন্তাধারার ক্রমবিকাশ ও বিবর্তনের পটভূমিকায় ইসলামি বাংলা সাহিত্যে এনেছেন রেনেসাঁস। কেননা ইসালম চিরন্তন, চিরবহমান এবং ইসলামি বাংলা সাহিত্যও চিরচলমান।
ষষ্ঠ, ইসলামি সাহত্যি স্থবির ও স্থানু নয়। অতীতের কিছু বস্তাপচা অসার অচল চিন্তাধারাকে নিয়ে চার পায়ী জীবরে ন্যায় জাবড় কাটাও নয়। ধর্মের সারহীন-প্রাণহীন, চেতনাহীন কচকচানিও নয়। পবিত্র কোরয়ানে দেখি শতকরা চারটি মাত্র ধর্মের কথা। বাকি ৯৬টি সমাজ গঠনের সামাজিক কথা। এটা কোরয়ানের কোন্ ইঙ্গিত। এক মহান ইঙ্গিত। যে ইঙ্গিতকে আধুনিক কালের মুসলিম সমাজ বোঝতে বোঝাতে ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইসলাম মূলত সমাজ গঠনের সামাজিক ধর্ম। ইসলামি সাহিত্যও সামাজিক সাহিত্য। সমাজ- চেতনার সাহিত্য।
সপ্তম, সবার উর্ধ্বে ইসলামি সাহিত্য মানবিক সাহিত্য মানবিক মূল্যায়নের সাহিত্য, তথা মানবিক মূল্যায়নের অবক্ষয় বোধের সাহিত্য। মনুষ্যত্বের সাহিত্য। আত্মোপলব্ধির সাহিত্য।
ইসলামি সাহিত্য হবে জাতিধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আবালবৃদ্ধবণিতার জন্য স্রষ্টার সৃষ্টি রাজ্যের অতমানের মুখপাত্র। প্রগতির পথে দুর্বার গতিতে সৃষ্টির কল্যাণে তার অনাদি-অনন্ত মহিমা নিত্য-নূতন ঢেউয়ের সৃষ্টি করবে যে সাহিত্যে, তাই-ই ইসলামি সাহিত্য। যেখানে চেতনাহীন- চিন্তাহীন সংকীর্ণতার লেশমাত্র থাকবে না। গোঁড়ামী-ভাঁড়ামী ও ধর্মান্ধতার গন্ধ ও যেখানে থাকবে না। যেখানে মুক্ত চিন্তার অবারিত স্রোতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সহস্র দরজা দিবা রাত্রি খোলা থাকবে। যেখানে মানুষের স্বাধীন চিন্তা কোন চিন্তাহীন ভাঁড়ের নিকট দাসখত লিখে দিবে না। যেখানে মানুষের মুক্ত চিন্তা, স্বাধীন চেতনা, জাগ্রত বিবেক, জ্বলন্ত বুদ্ধি ও বিবেচনা বিশ্বচেতনার!
