কবি জয়দেব বড়ু চণ্ডিদাসের রাঢ় বঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম। জন্মস্থানের পূর্ব দিকে নরোত্তম রাজার গড়ের ধ্বংসাবশেষ, দক্ষিণদিকে হাজী পালোয়ান নামক এক ফকিরের খনন করার পুকুর যার পূর্বে ফকিরের কবর আর পশ্চিমে মসজিদ। গ্রামে প্রাক্-দ্রাবিড় আর অনার্য গোষ্ঠীর মানুষ উচ্চ ও নিম্নবর্ণের হিন্দু-মুসলমান সকলের আত্মীয় স্বরূপ সহাবস্থানই এই গ্রামের বৈশিষ্ট্য। মসজিদের ইমামের অনুপস্থিতিতে নজরুল মাঝে মাঝে আজান দেওয়ার কাজও করতেন। আর্থিক প্রয়োজনে লেটো আঙ্গিকে পালাগান লেখার প্রয়োজনে অল্প বয়সেই হিন্দু ও মুসলমানের ধর্মীয় ধ্যানধারণায় পুষ্ট হয়ে ওঠেন। ছোটোবেলায় তাঁকে 'তারা খেপা' এবং 'নজর আলি' বলে ডাকা হতো।
এই শিশুই বড়ো হয়ে হন সর্বধর্ম-সমন্বয়ের এক জীবন্ত দলিল। সনাতনধর্মের শাক্ত-শৈব-বৈষ্ণব-নিরাকার-শ্রীরাম প্রভৃতির সঙ্গে ইসলাম সমস্ত ভুবনে করেছেন তাঁর অবাধ বিচরণ। বেতারে কোরাণের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণও করেছেন, তাঁর কলমেই স্বর্ণাক্ষরে বেরিয়েছে 'রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ', 'রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম' অনুবাদ। হোলি উৎসবে বন্ধুদের সঙ্গে রঙ মেখে ভাবে বিভোর হয়েছেন, আবার পবিত্র 'কোর-আন-শরীফ' মহাগ্রন্থের বাংলা পদ্যানুবাদে বিভোর হয়েছেন- যার ফলশ্রুতি 'কাব্য আমপারা' (আটত্রিশ সংখ্যক সুরা সমন্বিত)। শাক্তপদসংগীতে উৎকর্ষের উচ্চতম শীর্ষে আরোহণ করেছেন বললে অত্যুক্তি হয় না। বৈষ্ণব পদাবলিতেও বিদ্যাপতি-চণ্ডীদাস-জ্ঞানদাসের সঙ্গে তাঁর উপস্থিতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মর্তব্য।
সর্বধর্ম-সমন্বয়ের সাধক কবি নজরুল-এর ইসলাম ভাবনার প্রকাশ এই গ্রন্থ। ইসলাম কথার অর্থ শান্তি। মহান নবিজিও তাঁর অনুসরণকারীদের সকলের সঙ্গে ভ্রাতৃভাবে থাকার পরামর্শ দিয়ে গিয়েছিলেন। আল্লাহ্ রসুলের নিকট দোয়া ভিক্ষা করছি যে, ভক্তকবি নজরুলের মতো সর্বধর্ম নির্বিশেষে আমরা সকলে যেন ভ্রাতৃভাবেই একসঙ্গে বসবাস করি।
