আজকাল বাজারে ধর্মসম্পর্কীয় প্রকাশনার একটা প্রাচুর্ব দেখা যাচ্ছে, যার মধ্যে সহজ নামাজ শিক্ষা বা দীনিয়াত থেকে শুরু করে পবিত্র জীবন কাহিনি ও নানা রকম দর্শন তত্ত্বের আলোচনা সবই আছে। ইসলামের প্রচারণা ও বিকাশে সহায়তা হতে পারে বলে একে একটা শুভ লক্ষণ বলা চলে, কিন্তু প্রমাদ ঘটে যখন এর মধ্যে কিছু প্রকাশনা বিশেষ কোনো মতবাদ বা দর্শনের ব্যাখ্যা দিতে অবাঞ্ছিত বিতর্কের অবকাশ সৃষ্টি করে ও নানা বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। ধর্মীয় দর্শন ও অধ্যাত্মবাদের বিষয়সমূহ স্বভাবতই নানা জটিলতায় সমাকীর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ স্পর্শকাতরতাও আছে। কাজেই এসব বিষয়ে আলোচনার অবতারণা করতে গিয়ে জটিলতা নিরসনের পরিবর্তে যদি সন্দেহ ও সংশয় বৃদ্ধি করে তবে তা কোনোমতেই মঙ্গলজনক হতে পারেনা। 'কলেমা দর্পণ' এই দুরুহ ক্ষেত্রে একটি নতুন সংযোজন যা এই সমস্যা এড়িয়ে তাত্ত্বিক পর্যালোচনার দুর্গম অলিতে-গলিতে আলোকপাত করে কিছু শাশ্বত সত্যকে সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট করে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছে।
'কলেমা দর্পণ'-এর লেখক ফকির আলতাফ হোসাইনের মৌলিক শিক্ষা বিজ্ঞানভিত্তিক এবং কৃষিবিদ্যায় তার একটি মৌলিক স্নাতক ডিগ্রীও আছে। বাস্তব জীবনে আধ্যাত্মিক আচার ও সুফি জীবনের ব্যবহারিক দিকগুলো দীর্ঘকাল ধরে তার ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে। তার কাছ থেকে পাঠক সমাজ ইসলামের মৌলিক বিষয়বস্তু সম্পর্কে যে উপহার পেয়েছেন তাতে তার জিজ্ঞাসু মন এবং ইসলামের আত্মসমর্পণের ও শৃঙ্খলাবোধের নির্দেশের সংমিশ্রণ রবিফালত হয়েছে। ইসলামি অঙ্গনে প্রবেশের একটি সাবশ্যিক প্রাথমিক শর্ত হিসেবে কলেমাসমূহের অনুশীলন অথবা ফানাপ্রাপ্তির উদ্দেশে কলেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু-র জিকিরে অবরোহণ ও আরোহণ কিংবা তৌহিদে শাহুদ ও তোহিদে অজুদীর আপাত যম, এদের কোনোটাই বাদ স্তোন তার সংক্ষিপ্ত ও সুবিন্যস্ত আলোচনা পরিসর থেকে। কলেমা তৈয়াবা, কলেমা শাহাদত, কলেমা তৌহিদ,
কলেমা নূর। এই চারটি কলেমা সম্পর্কে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে 'কলেমা দর্পণ'-এ। তবে স্বাভাবিক কারণেই কলেমা তৈয়্যবের তাৎপর্য ও ব্যাখ্যাই পর্যালোচনার বহুলাংশ জুড়ে আছে। চারটি কলেমাই আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স.)-এর প্রতি ঈমানের তাকিদের একটি সূতায় গাঁথা। তবে প্রতিটি কলেমারই যে আলাদা করে বৈশিষ্ট্য আছে তা স্বচ্ছভাবে ফুটে উঠেছে লেখকের আলোচনায়। সবচেয়ে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে কলেমা তৈয়াবায় একদিকে আল্লাহর অনন্ত, অসীম পরমসত্তার কথা ও অপরদিকে হাকিকতে মোহাম্মদীর গূঢ়তত্ত্ববাদ এবং এই দুয়ের মধ্যে সম্পর্কের ব্যাখ্যা।
লেখকের নিজের ভাষায় তিনি একজন শিক্ষানবিশ মনোভাব নিয়ে যুক্তি-তর্ক পর্যালোচনায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাই তিনি নির্ভীকভাবে বিভিন্ন মতবাদ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গির বৈষম্য, বস্তুবাদ বা দেহতত্ত্ববাদ, পদার্থবিজ্ঞানের অণু-পরমাণুর বিশ্লেষণে জগতের অস্তিত্ব; কিংবা কোরআন মজিদের আলোকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অবস্থান। যে কোনো বিষয়ই হোক, সর্বদিকের যুক্তিগুলোই মোটামুটি ভারসাম্য রেখে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। আর যুক্তির প্রতি আস্থা আছে বলেই বিশ্বাস ও তর্কের স্ববিরোধিতা, 'আমিত্ব' বিসর্জনে ফানা অর্জন সম্ভব কিনা, "আনাল হকের" তাৎপর্য কী এবং নূরে মোহাম্মদী কেন জগৎ সৃষ্টির মূল ইত্যাদি সুকঠিন বিষয়ের গভীরে যেতে পিছপা হয়নি। সব জায়গায় তল পাওয়া গেছে সেকথা আমি বলব না, তবে কৃতিত্ব এই যে, এইসব বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কোথাও হোঁচট খাননি বা পাঠককে বিভ্রান্ত করে তুলেননি। যে পাঠকের সচরাচর ইসলামি অধ্যাত্মবাদের দিকে মনোযোগ দেয়ার অবকাশ হয় না, তারাও চমৎকৃত হবেন যে, সাধারণ কলেমার অসাধারণ যে দিকগুলো আছে তার আলোচনায় কীভাবে এই অধ্যাত্মবাদের কথাগুলো উঠে আসে। বিষয়কে ঘোলাটে না করে কঠিন কথা সহজভাবে বোঝাবার লেখকের এই প্রয়াসকে আমরা মোবারকবাদ জানাই।
