হযরত রাবিয়া আল-বসরী (রা.) সুফিদের শিরোমণি। সুফিবাদের কিংবদন্তি মহা তাপসী মহীয়সী নারী। বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ আউলিয়াদের অন্যতম। তিনি হযরত ইমাম হাসান আল-বসরী (রা.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন মহা তপস্বিনী, আল্লাহ-প্রেমে দন্ধীভূতা, সংসার বিরাগিনী ও আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত মহান সাধ্বী রমণী। তিনি পিতার চতুর্থ কন্যা ছিলেন বলে তাঁর নাম রাখা হয় রাবিয়া। আরবি ভাষায় রাবিয়া অর্থ চতুর্থ। তিনি বসরার অধিবাসী ছিলেন। হযরত রাবিয়া বসরী (রা.) বয়োঃপ্রাপ্ত হলে তাঁর পিতামাতা ইন্তেকাল করে। ফলে দাসীরূপে এক অত্যাচারী লোকের বাড়িতে তাঁর আশ্রয় জোটে। সেখানে তাঁকে অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করতে হত। কথিত আছে, তিনি দিবারাত্র এক হাজার রাকাত নামায আদায় করতেন । হযরত খাজা হাসান বসরী (রা.) তাঁকে খুবই প্রীতির চোখে দেখতেন। তিনি নিষ্কাম প্রেমের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি ১৬০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সময় শিয়রে উপবিষ্ট বুজুর্গানদিগকে তিনি বাইরে যেতে বলেন। সবাই বাইরে গেলে গায়েবী শব্দ হলো, “হে পরিতৃপ্ত আত্মা, তুমি সন্তুষ্টচিত্তে আমার দিকে প্রত্যাবর্তন করো।” ভিতরে এসে সবাই দেখতে পেলেন, হযরত রাবিয়া আল-বসরী (রা.) মহান আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিয়ে দীলারে এলাহীর মহামিলনের জন্য ইহলোক পরিত্যাগ করে পরম প্রেমাস্পদ আল্লাহ্র কাছে চলে গেছেন ।
বিশ্বের প্রখ্যাত এই মহা তাপসী হজরত রাবেয়া আল আদাবিয়া (রা.) ইরাকের বসরা নগরীতে ৭১৩ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মো. ইসমাইল। মাতার নাম : মায়ফুল। তিনি ৮০১ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।
তাঁর পিতা ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র। নিদারুণ অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে দিন অতিবাহিত হচ্ছিল তাদের। যে রাতে হজরত রাবেয়া বসরী (রা.) জন্ম নিলেন, রাতের অন্ধকার ঘোচাতে ঘরে প্রদীপ জ্বালানোর সামান্য তেলটুকুও ছিলনা তাঁদের। রাবেয়া বসরী (রা.)-এর পিতা ইসমাইল তেলের সংস্থান
করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন ঘরে। স্ত্রীর অনুরোধে তেল ধার করতে যান প্রতিবেশীর কাছে। কিন্তু তেল দেয়া তো দূরের কথা, বার বার ডাকা সত্ত্বেও ঘরের দরজাই খুললেন না প্রতিবেশী। অশ্রুসজল নয়নে বাড়ি এসে কিছু সময় পর তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন তিনি। গভীর ঘুমে স্বপ্ন দেখেন, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) এসে তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। বলছেন, দুঃখ করো না, অচিরেই তুমি এক মহীয়সী কন্যা সন্তানের জনক হতে চলেছ। ভবিষ্যতে সে জগতের এক অত্যুজ্জল নক্ষত্রে পরিণত হবে।
স্বপ্নযোগে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে লিখিত একটা চিরকুট নিয়ে বসরার আমির ঈসার নিকট যেতে বললেন। চিরকুটটিতে লেখা ছিল, “হে আমির ঈসা, তুমি প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় একশত বার দরুদ পাঠ করো, আর জুমুআর রাতে পাঠ করো চারশত বার। যেহেতু এই জুমুআর রাতে তুমি চারশত বার দরুদ শরীফ পাঠ করো নি, তার কাফফারা স্বরূপ চারশত দিরহাম দান করে দাও।”
ঘুম ভেঙে গেল হজরত রাবেয়া বসরীর (রা.)-এর বাবা ইসমাইলের। স্বপ্ন অনুসারে তিনি কথাগুলো চিরকুটে লিখে চলে গেলেন বসরার আমিরের কাছে। চিরকুটের লেখা পড়ে চমকে উঠলেন আমির ঈসা। তিনি বুঝতে পারলেন এটা কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অমিয় বাণী ও নির্দেশ। তিনি তৎক্ষণাৎ নবী করিম (সা.)-এর উপদেশের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ দশ হাজার দিরহাম দান করলেন। আর পত্র বাহককে দিলেন চারশত দিরহাম 1
ইতোমধ্যে হজরত রাবেয়া বসরীর জন্ম হলো। পিতা-মাতার আদর স্নেহে বড় হতে লাগলো এই জগদ্বিখ্যাত মহা তাপসী রমণী। কিন্তু শৈশবকালেই চিরবিদায় নিলেন রাবেয়ার গর্ভধারিণী জননী। তার কিছুদিন পর বিদায় নিলেন তাঁর পিতা মুহাম্মদ ইসমাইল। চারটি অনাথা বোন নিয়ে অকূল সাগরে পতিত হলেন রাবেয়া বসরী (রা.)। চলতে থাকলো তাঁর জীবন সংগ্রাম। মা-বাবা নেই। একজন এতিম বোনের পক্ষে এতগুলো জীবনের ভরনপোষণের জন্য শুরু হলো রাবেয়ার কঠিন জীবন সংগ্রাম। চার বোন মিলে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করতে লাগলো ওরা। কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে! এমন সময় বসরায় দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। এখন আর কেউ কাউকে কাজে নিতে চায় না, উল্টো চার বোনের কাজ চলে গেল। দিশেহারা চার বোন কাজের সন্ধানে বাড়ি বাড়ি ছুটতে ছুটতে পৃথক হয়ে গেল। দুর্ভিক্ষ এমন পর্যায়ে চলে গেল যে, পিতা মাতারাও নিজেদের সন্তানদের বিক্রি করে দিতে শুরু করলো। জীবন বাঁচানো অনেক কষ্টকর হয়ে উঠলো। এমন দুঃসময়ে হজরত রাবেয়া বসরী (রা.)'র তিন তিনটি বোনই কোথায় যেনো হারিয়ে গেল। অনেক খুঁজে তাদের হদিস পাওয়া গেল না। এবার রাবেয়া বসরী বিশাল পৃথিবীর বুকে সম্পূর্ণ একা হয়ে
পড়লেন।
নিঃসঙ্গ রাবেয়া বসরী কান্নাকাটি করে কাটাতে লাগল দিনের পর দিন। হঠাৎ এক পাষণ্ড এসে তাঁকে জোর করে তুলে নিয়ে গেলো দাসী কেনা বেচার হাটে। তাঁকে বিক্রি করে দিলো ততোধিক পাষাণ হৃদয় এক ব্যক্তির নিকট। এভাবে ক্রীতদাসীতে পরিণত হলেন হজরত রাবেয়া বসরী (রা.)। দিন রাত তাঁকে কাজ করতে হয় গৃহস্থ মনিবের বাড়িতে। কাজে একটু এদিক ওদিক হলেই কপালে জোটে নির্মম প্রহার! নির্যাতন! কোথাও এক ফোঁটা আদর নেই, ভালোবাসা নেই। বুকভরা গঞ্জনা, পীড়ন আর অত্যাচারের ভয় নিয়ে দিন কাটে নাবালিকা রাবেয়ার। একটা সময় সবকিছু সহ্যের বাইরে চলে যায়।
মনিবের বাড়ি থেকে পালিয়ে যান রাবেয়া বসরী (রা.)। রাতের অন্ধকারে মুক্তির নেশায় বিভোর হয়ে দৌড়াতে গিয়ে হঠাৎ আচমকা মুখ থুবড়ে পড়ে যান মাটিতে। সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যায় তাঁর একটি হাত! তীব্র যন্ত্রণায় গোঙাতে থাকেন রাবেয়া। ভাঙা হাত নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন তিনি। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে প্রার্থনা করেন, “হে প্রভু আমার! আমি এক অসহায় এতিম দাসী! সমগ্র জগত যদি আমার ওপর বিরূপ হয়, তাতে আমার কিছু আসে যায় না। কেবল তুমি আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকলেই আমি খুশি।”
প্রার্থনা অঢেল প্রশান্তি এনে দেয় রাবেয়া বসরীর মনে প্রাণে। হৃদয়ে স্বস্তি জাগে তাঁর। ভাঙা হাত নিয়ে এখন কি করবেন তিনি? ধীর পায়ে ফিরে চললেন আবার সেই মনিবের বাড়ি। হোক মনিব নিষ্ঠুর! তবু তো একটা মাথা গোঁজার
ঠাঁই আছে।
এখন থেকেই শুরু হলো রাবেয়া বসরীর উপাসনার জীবন। সারাদিন কাজ করেন তিনি। সারারাত জেগে জেগে কাটান প্রভুর উপাসনায়। হঠাৎ এক মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যায় রাবেয়া বসরীর মনিবের। অস্পষ্ট কিছু কথার গুঞ্জন শুনতে পান তিনি। গভীর অন্ধকারে কার কথার শব্দ? খুঁজতে যেয়ে দেখতে পান রাবেয়া একান্তে মনে প্রভুর উপাসনা করছে।
আকুল স্বরে প্রার্থনা করছে প্রভুর দরবারে। রাবেয়ার আকুল প্রার্থনা শ্রবণ করে মন গলে যায় মনিবের। প্রার্থনাগুলো হৃদয় স্পর্শ করে মনিবের নিষ্ঠুর হৃদয়ে। তার মনে হয়, এ কোনো সাধারণ দাসী বাদী নয়। এর মধ্যে রয়েছে ঐশ্বরিক ক্ষমতা ও প্রভুর অনুগ্রহ।
পরদিন সকালবেলাতেই মনিব মুক্ত করে দেয় হজরত রাবেয়া বসরী (রা.)-কে। এবার রাবেয়া বসরী মুক্ত। নিজের সম্পূর্ণ জীবনকে তিনি উৎসর্গ করলেন প্রভুর ইবাদত-উপাসনায়। মগ্ন হলেন গভীর ধ্যানে। ধ্যান সাধনাতেই কাটতে লাগলো তাঁর সমগ্র দিন রাত।
সময় পেলেই যেতেন তৎকালীন শ্রেষ্ঠ তাপস ও বিখ্যাত আউলিয়া হজরত খাজা হাসান বসরী (রা.)-এর নিকট। খাজা হাসান বসরী (রা.)-এর নিকট