ভূমিকা
এক ব্রহ্ম দ্বিতীয় নাতিঃ। এক সত্য সকল মিথ্যা। এই সত্যকে আপনি আত্মা বলেন, ঈশ্বর বলেন, আল্লাহ বলেন, অথবা গুরু বলেন, গোসাই বলেন, মুর্শিদ বলেন। এই চরম সত্য মানুষের মধ্যেই অন্তর্নিহিত আছে। এই সত্যকে উদ্ভাসিত করা, এই সত্যের জাগরণ ঘটানো একমাত্র চাবিকাঠি হচ্ছে ধ্যান। বস্তু মোহের পর্দায় এই সত্যকে ঢেকে রাখাকে কাফের বলে । এই কাফিরি পর্দাকে উন্মোচন করে সত্যকে মুক্তি দিলে মানবের মুক্তি হয়। “ধ্যান মুক্তির দুয়ার” বইটি এই মুক্তি পথের পাথেয়
আপন (নস) সত্ত্বাকে বিলুপ্ত করে ধ্যানের প্রক্রিয়ায নসকে বিবর্তনের (Evolution) ধারাবাহিকতায় উচ্চতর স্তরে প্রতিষ্ঠার জন্য গুরু বা মুর্শিদের প্রতি চরম প্রেমও দরকার। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সুদীর্ঘ ১৫টি বছর বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (আঃ) হেরা গুহায় ধ্যান করে ঐ গুহাকে “ধ্যান তহা” হিসাবে পরিচয় করিয়েছেন। সকল মহামানব, মহাপুরুষ, অলি আল্লাহ, গাউস কুতুব, মনি ঋষি, আউলিয়া ও আম্বিয়ারা ধ্যান করেছেন। উদাহরণস্বরূপ কয়েকজন মহাপুরুষের ধ্যান জীবন এই বইটিতে উল্লেখ
আছে!
বর্তমান সমাজে একমাত্র মুমিন বা সিদ্ধপুরুষ ব্যতিত সকলি সংসার সমুদ্রে বস্তুমোহে বন্দি। মানুষের মধ্যে চক্ষু, কর্ণ, নাম্বিকা, জিহ্বা, কণ্ঠনালী, দেহ ও মন ইন্দ্রিয়গুলো দ্বারা রাশি রাশি বিষয় মাথায় প্রবেশ করে আর জমা হয়। এইগুলোতে মানুষ মত্ত থাকে, কোনো ইবাদত বা যে কোনো কর্ম করার সময় মাথায় জমাকৃত বিষয়গুলো কল্পনা হয় আর মনকে উহার মধ্যে বন্দি করে রাখে। এই বন্দি মন দিয়ে জীবনের কোনো কর্ম সাধনা সিদ্ধ করা যায় না। এই বন্দি জীবন মুক্তি পাওয়ার জন্য সামান্য সহায়ক হিসেবে “ধ্যান মুক্তির দুয়ার” বইটি আপনাদের কোমল চরনে দাড় করানো
হলো ।
লেখকের এই দাসত্ব ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য আবেদন রইল।
গ্রন্থকার
ধ্যান মুক্তির দুয়ার ॥ ৯
ধ্যানের পূর্বাবস্থা
মানুষ স্বভাবগত সংসার জীব। সংসার সমুদ্রে মানুষ গভীর জলে ডুবে থাকে। বস্তু চাহিদা তার মৌলিক উপাদান। বস্ত্রর বাইরে কোন জ্ঞান, ধ্যান, চিন্তা করা মানুষের স্বভাবে নেই। বস্তুর কঠিন মোহে মানুষ বন্দি থাকে। মানুষের জীবন শুরু হয় কামনা, বাসনা দিয়ে তাও বস্তু ব্যতীত নয়। ধর্মীয় তত্ত্বানুসারে মানুষ যখনই যার উপর নির্ভরশীল তখন ঐ বস্তুই তার উপাস্য বা প্রভু। স্বাভাবিক জীবনে মানুষ এই বস্তুজগতের বিভিন্ন কিছুর উপর নির্ভর করে। এই নির্ভরশীল বস্তুই তার ইলাহা হয়। মানুষ আল্লাহ এবং তার প্রতিনিধি ব্যতীত অন্য কোন অভিভাবকের তাবেদারী করাও উপাস্য। প্রথম জীবনের এই রূপ ধর্ম কর্ম পরিত্যাজ্য করার কথা সর্বধর্মে উল্লেখ করেছেন। যেমন “লা ইলাহা” এখানে 'লা' অর্থ নাই/না । ইলাহা বস্তুজগতের উপাস্য। শাস্ত্রে বলে পূর্ব স্বভাব ত্যাজ্য কর। এই অবস্থায় কামেল মুর্শিদের নিকটে যেতে বললে তখন যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে এবং তার পিতাকে ইলাহা ও মাকে ইলাহা পরিচয় দেয়। তারা জীবিত থাকতে নাকি কামেল ওলির প্রয়োজন নাই। এই বস্তু সংসার মোহের মধ্যে তারা ফাটল ধরাতে চায় না। মোহের জেলখানায় তারা আনন্দের বাগান বানাতে চায়। সুন্দর ঘরবাড়ি আর রঙিন শাড়ি পরিধান করা প্রকৃতি। কয়েক দিন পরে নতুন বাসনা হয় ছেলেমেয়ের। মোহের স্রোতে ভেসে আসে সন্তান। এবার নতুন বাসনা ছেলেমেদের পড়ালেখা। পরবর্তী বাসনা তাদের ভবিষ্যৎ। সকল চাহিদা পূরণ করাই তার সাধনা। পরকালের কথা ভাবার সময় নেই। বেলা যেতে যেতে পশ্চিম আকাশে- কবি কায়কোবাদ বলেছেন,
"দিল যে চলিয়া গেল- কাকা নিশি এল এল
কে দিবে দেখাইয়া পথ- কোথায় যাব চলি”
স্বভাবগত ভাবেই বৃদ্ধাবস্থায় মৃত্যুর ভয় আসে। রোগ, শোক, ব্যথা ও বেদনায় জর্জরিত। এই অবস্থার ঘন ঘন মনে পড়ে, ফেলে আসা জীবনের কে কোথায় যাব? কি করব? আমার পারের কাণ্ডারী কে? কিভাবে মুক্তি কোথাও এই রূপ ভাবনায়। সংসার জীবন জনম জনম অতিবাহিত হয়। সংসারে দুঃখ ভোগ করে। নিজের মাথা বিষয়ের সমুদ্র হতে থাকে