উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের তিন শতাব্দীর তিন মহাজন মীর, গালিব, ইকবাল। মীর অষ্টাদশ শতাব্দীর, গালিব উনবিংশ শতাব্দীর এবং ইকবাল বিংশ শতাব্দির উর্দু কাব্যের তিন নক্ষত্র উর্দু স্ব-মহিমায় বিরাজমান। দেশে-বিদেশে সমান চর্চিত, সমান আলোচিত, সমান আলোকিত।
মীর সম্পর্কে কোনও কিছু লেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে গালিব ও ইকবাল সম্পর্কে হয়েছে। ১৯৯৫ সালে আমি গালিবের জীবনী, মির্জা গালিব অনুবাদ করি। ১৯৯৬ সালে মূল উর্দু সহ গালিবের ১০১ টি শের আমি কাব্যানুবাদ করি। শেষে ব্যাখ্যা ও টিপ্পনি দিই।
উর্দু একটি সুমিষ্ট ও চিত্ররূপময় ভাষা। তার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস একটি ভাষাতাত্ত্বিক বিষয়। আমি ওই দিকটায় যাচ্ছি না। এ বিষয়ে আমি এটুকুই বলতে চাই যে, উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে ছোট-বড় অসংখ্য কবি-সাহিত্যিকের নাম উল্লেখিত ও
আলোচিত হয়েছে। তাদের মধ্যে সর্বাধিক পঠিত ও আলোচিত কবি হলেন আল্লামা
মুহম্মদ ইকবাল। তাঁর কাব্য সারা পৃথিবীর কাব্যানুরাগীদের মন জয় করেছে। ইকবাল আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী একজন বিশ্ববিখ্যাত কবি। উর্দু সাহিত্যের শেষ্ঠ কবি হিসেবে তাঁর নামটিই উল্লেখিত হয়ে আছে। তাঁর সম্পর্কে বলা হয় যে উর্দু ভাষা ও কাব্যকে তিনি নতুন জীবন দান করেছিলেন। সে জন্য তাঁকে শায়ের এ মাশায়ে ও বলা হয়। তাঁর কাব্যমুগ্ধ পাঠককূল তাঁকে আল্লামা উপাধি দিয়েও সম্মানিত করেন।
আল্লামা মুহম্মদ ইকবাল ১৮৭৭ ঈসায়ী অব্দের ৯ নভেম্বর তৎকালীন অবিভক্ত পাঞ্জাব ও বর্তমান পাকিস্তানি পাঞ্জাবের সিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ব পুরুষ কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁরা প্রায় তিন শ বছর পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল নূর মুহাম্মদ। তিনি একজন বিদ্বান এবং দরবেশ প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। ১৯০৮ ঈসায়ীতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
উর্দু কাব্যের সৌভাগ্য যে, ইকবালের মতো কবি লাভের সৌভাগ্য তার হয়েছে যে উর্দু কাব্যের পাঠক হৃদয়ে তিনি চিরস্থায়ী আসন লাভে সমর্থ হয়েছেন এবং জীবন ও জগত সম্পর্ক তাঁদের অনুভব অধরা ইকবালের ভাষায় প্রকাশ করেন। ইকবাল সিয়ালকোটে এবং এ করার পর লাহোরের বি.এ কারণ এবং দর্শনের শিক্ষা ও তিনি সেখানেই লাভ করেন। লাহোরে তিনি মুশায়েরায় অংশ নিতেন। সেখানে তিনি নজম ও গজলও পাঠ করতেন।
সে যুগের বিশিষ্ট কবি ও কাব্য সমালোচক মির্জা আরশাদ গুরগানি তার কাব্যপাঠ ও গজল শনে তাঁকে মির্জা সাহেবজাদা বলে অভিহিত করেন।
এইভাবে তাঁর কাব্য পাঠের ধারা জারি থাকে। ১৯০৫ ঈসায়ীতে উচ্চ শিক্ষার্থে তিনি ইউরোপ চলে যান এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দর্শন নিয়ে পড়াশুনা করেন। তিনি ইরানের দর্শন নিয়ে গবেষনা নিবন্ধ লেখেন। এর ভিত্তিতে জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি প্রদান করেন। ১৯০৮ ঈসায়ীতে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯০৮ ঈসায়ীতে কলেজ শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি সেখানে আড়াই বছর শিক্ষকতা করে ওই পদে এই মর্মে ইস্তফা দেন যে, সেখানে তাঁর স্বাধীন চিন্তাধারা ব্যাহত হচ্ছে। তখন তিনি ব্যারিস্টারি করতে শুরু করেন।
১৯২৬ ঈসায়ী অব্দে তিনি লাহোর কাউন্সিলে সদস্য পদ লাভের জন্য নির্বাচনে লড়েন এবং জয়লাভ করেন। ১৯২৮ এ তাঁকে মাদ্রাজে লেকচারার হওয়ার জন্য আহ্বান করা হয়। মাদ্রাজ থেকে মহীশূর এবং হায়দারাবাদ সফর করেন এবং সকল স্থানে তাঁকে বিপুলভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়। ১৯৩০ এ মুসলমানদের পুরাতন আনজুমান মুসলিম এলাহাবাদ তাদের বার্ষিক অধিবেশনে ড. মুহম্মদ ইকবালকে সভাপতি করেন। ইকবাল তার জীবনের পরবর্তী সময় লাহোরে অতিবাহিত করেন এবং তাঁর ইন্তেকালের তিন বছর পূর্বে একটি বাড়ি নির্মাণ করেন যার নামকরণ তিনি তাঁর পুত্রের নামে করেন 'জাভেদ মনজিল'। পরে তা বিখ্যাত হয়ে ওঠে।
আল্লামা ইকবাল তাঁর জীবৎকালে প্রচুর সম্বর্ধনা ও খেতাব লাভ করেন। তবে সাধারণভাবে তিনি আল্লামা ইকবাল নামে সুপ্রসিদ্ধ হন।
তিনি শুধু উর্দুতে নন, ফার্সি ভাষায়ও তিনি বহু কিছু লেখেন কিন্তু জীবনের শেষ দিকে তিনি উর্দু কাব্যের প্রতি বেশি মনোযোগ দেন কাব্য বাংশ-এ-দারা, বালে জিপ্রিল; জরবে কলিম ও আয়মুশানে হেজাজ লাভ করেন যা ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও স্বীকৃত হয়। এ থেকে অনুমান করা যায় যে তাঁর নজম ও শায়ের উর্দু ভাষীদের হৃদয়
জয় করে নিয়েছিল। আল্লামা ইকবাল ৬৫ বছর আয়ু পান। ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল তিনি ইন্তেকাল করেন। মুহুর্তের মধ্যে তাঁর ইন্তেকালের খবর দেশ-দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। বেলা আর জানাজা হয় এবং অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নেন। লাহোরের পদশাহী মসজিদের মিনার সংলগ্ন স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
ঘুমন্ত হৃদয়কে জাগ্রতকারী। হতাশাগ্রস্তদের হৃদয় আশার সঞ্চারকারী, মানবজাতির বিবেক ও মনুষ্যত্বকে খোলেন। যেন একজন শ্বেত কপোত তার ও যন্ত্রবাদক ও দুনিয়া ছেড়ে জান্নাত নামক রিরস্থায়ী শান্তির নীড়ের উদ্দেশ্যে উড়ে গেলেন।
