প্রথম প্রকাশের ভূমিকা
আউলিয়া জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হজরত খাজা সাইয়েদ বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নকশবন্দ রহমাড়ুল্লহি আলায়হি। চারিটি তরিকার মধ্যে তাঁহার তরিকাই অন্যতম শ্রষ্ঠ ডরিকা ৷ নকশবন্দিয়া তরিকার ইমাম তিনিই ।
1
পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মোজাদ্দেদ হজরত শায়েখ আহমদ ফারুকী সেরহিন্দি রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁহার সিলসিলার খলিফা হজরত খাজা বাকী বিল্লাহ্ র এর নিকট হইতে এই তরিকার নেসবত হাসিল করিয়া এতই মুগ্ধ হন যে, তাজবীদের মহান দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য একমাত্র নকশবন্দিয়া তরিকাকেই তিনি উপযুক্ত ও যথেষ্ট মনে করেন। তাঁহার দ্বারাই এই তরিকা সমগ্র বিশ্বে ছড়াইয়া পড়ে। হজরত মোজাদ্দেদে আলফেসানি র. এই নরুন্দিয়া সিলসিলার কীরূপ প্রশংসা করিয়াছেন মকতুবাত শরীফ' পাঠকগণের নিকট তাহা অবিদিত নাই ।
প্রায় ছয়শত বৎসর পূর্বে হজরত বাহাউদ্দিন নকশ্বন্দ র. দুনিয়া হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়াছেন। সময়ের ব্যবধান ছয়শত বৎসর। স্থানের ব্যবধান হাজার হাজার মাইল । ভাষার ব্যবধান আরও বেশী। কিন্তু ইশকের সাম্রাজ্যে কোন ব্যবধানই টিকে না। খালেস্ আশেকগণ আজো হজরত নকশ্বন্দ র. এর দিলের ইশকের ইশারা নিজেদের দিলে অনুভব করিতে পারেন। এই কারণেই হাদিস শরীফে বর্ণিত হইয়াছে যে যাহাকে ভালবাসে সে তাহার সঙ্গে।
'নকশায়ে নকশ্বন্দ' কেভাবে হজরত বাহাউদ্দিন র. এর জীবনের নকশা (জীবনী) আঁকিবার চেষ্টা করা হইয়াছে। নকশা যদিও পূর্ণাঙ্গ বলিয়া দাবী করা যায় না— কিন্তু ইহাকে অপূর্ণাঙ্গ মনে করাও সমীচীন হইবে না। ইনশাআল্লাহ্ প্রকৃত আশেকগণ কেতাবে পরিবেশিত খণ্ড-চিত্রসমূহের মাধ্যমে হজরতের পূর্ণাঙ্গ নকশা ধারণায় আনিতে সক্ষম হইবেন। অবশ্য প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবেই এইরূপ করিতে হইয়াছে। পূর্ণ আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও ঘটনার ধারাবাহিকতাও রক্ষা করা সম্ভব হয় নাই ।
নকশারে নকশ্বন্স' কেতাব রচনার জন্য 'হালাতে মাশায়েখে নকশবন্দিয়া মোজাদ্দেদিয়া' এবং 'তাজকেরাতুল আউলিয়া' কেতাবদ্বয়ের সহায়তা লওয়া হইয়াছে! উক্ত দুই কেতাবের পাঠকবৃন্দের নিকট অবিদিত নাই যে, পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনার জন্য কেতাব দুইটিতে পরিবেশিত তথ্য কীরূপ অপ্রতুল। কিন্তু ব্যাপারটি প্রায় দুরূহ হইলেও রঙের জীবনীর্থলিত স্বতন্ত্র কেতাব রচনা করিবার প্রবল আবেগ সম্বরণ করিতে পারি
ভাবিয়া বিস্মিত হই যে, মশহুর তরিকার অন্যান্য ইমামগণের জীবন কাহিনীসম্বলিত বহুসংখ্যক স্বতন্ত্র কেতাব এ পর্যন্ত রচিত বইলেও আজ পর্যন্ত হজরত বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নকশবন্দ র. এর জীবনের উপরে স্বতন্ত্র কোনো কেতাব বাংলা ভাষায় রচিত হয় নাই। ইহা বড়ই আফসোসের কথা। বহু পূর্বে তরিকার অন্যান্য ইমামগণের মতো তাহারও স্বতন্ত্র জীবনীগ্রন্থ রচিত হওয়া উচিত ছিল। এই কেতাব রচনার উদ্দেশ্যও এই যে, স্বতন্ত্র কেতাব রচনার মাধ্যমে তাঁহার প্রতি যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করা। বরং এই প্রথম হজরতের জীবনী স্বতন্ত্র কেতাব আকারে প্রকাশ করিতে পারিয়া নিজেকে ধন্য মনে করিতেছি। অসংখ্য শোকর আল্লাহ্পাকের দরবারে যে, তিনি অধমের এই এরাদা বাস্তবায়িত করিলেন। আলহামদু লিল্লাহ্! ইহা আল্লাহ্পাকের দরবারে মকবুল হইবে বলিয়াও এই গোনাহ্গার দৃঢ়ভাবে আশা পোষণ করিতেছে।
'নকশবন্দ' শব্দের অর্থ নকশাকার। মূল নাম অপেক্ষা এই নামেই তিনি সমস্ত দুনিয়ায় মশহুর হইয়া আছেন। তাহাকে 'নকশবন্দ কেনো বলা হয়, সে সম্পর্কে বিভিন্ন ব্রুকম বর্ণনা পাওয়া যায় ।
যেমন, যখন তিনি তাঁহার মোর্শেদ হজরত আমির কুলাল র. এর নিকট তরিকা শিক্ষার জন্য নিজেকে সমর্পণ করেন, তখন হজরত আমির কুলাল র. তাঁহার সম্পর্কে বলিয়াছিলেন 'নকশ বাহাউদ্দিন রা বর বন্দ' এই কারণে তাঁহাকে নকশবন্দ বলা হইত। কেহ কেহ বলিয়াছেন, যে সকল তালেবে মাওলা রূহানী তালিম লাভের জন্য তাঁহার নিকট হাজির হইতেন, তাহার তাওয়াজ্জোহ্ ওই সকল সালেকের অন্তরে এমনভাবে নকশা অংকন করিত যে, তাঁহারা অতি সহজেই তাঁহাদের মকসুদ মঞ্জিলে পৌছিয়া যাইতেন। কেহ বলিয়াছেন, তিনি নিজে মুরিদগণকে 'আল্লাহ্' নামটির নকশা লিখিয়া দিয়া তাঁহাদেরকে এরশান করিতেন "অবিরাম ধ্যান করিয়া এই নামের নকশা তোমাদের অন্তরে আঁকিয়া লও যাহাতে তোমাদের অন্তর কুলুবুল মু'মিনীনা আরশিল্লাহ্' (মুমিনের হৃদয় আল্লাহ্পাকের আরশ — এর রূপ লাভ করিতে পারে।' আরও বলা হয়, তিনি যখন দ্বিতীয় বারের মতো হজ্ব সমাপন করিয়া হেরাত গিয়াছিলেন, তখন সেখানকার বিখ্যাত বুজর্গ তাঁহার নিকট আরজ জানাইয়াছিলেন 'হে খাজা নকশ্বন্দ! মেহেরবানি করিয়া আমাকে তাওয়াজ্জোহ্ প্রদান করুন। উত্তরে হজরত বলিয়াছিলেন 'আমি আপনাকে নকশের (অনুসরণের) জন্য এখানে আসিয়াছি। — এই ঘটনার পর হইতেই তিনি নকশবন্দ নামে খ্যাত হইতে থাকেন।
আল্লাহপাকই ভাল জানেন, উপরোক্ত বর্ণনাসমূহের মধ্যে কোনটি সঠিক। তবে যাহাই হউক না কেন, তিনি যে আজীবন নিপুণ এবং অসামান্য প্রেমের রঙে মানুষের মনে আল্লাহপ্রেমের নকশা আঁকিয়া গিয়াছেন— ইহাতে কোনই সন্দেহ নাই। বরং এখনও তাঁহার সিলসিলার বলিফাগণের মাধ্যমে সেই নকশা আঁকার কাজ জারী রহিয়াছে। ইনশাআল্লাহ্ কিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকিবে। এ কথাও স্পষ্টরূপে অনুমান করা যায় যে, হাজার হাজার আউলিয়ার মধ্যে নকশা আঁকার ধরনে তাঁহার এমন এক বিশেষত্ব ছিলো যাহা অন্য কাহারও মধ্যে ছিলো না। এই কারণেই 'নকশ্ববন্দ' নামে শুধুমাত্র তাঁহাকেই অভিহিত করা হইয়াছে ।
মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ হাকিমাবাদ খানকায়ে মোজাদ্দেদিয়া,
ভুইগড়, নারায়ণগঞ্জ।
দ্বিতীয় প্রকাশের ভূমিকা
বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এই যে, যে জীবন ধারণ করে আমরা বেঁচে আছি, তার সূচনা ও সমাপ্তি সম্পর্কে আমরা অনেকেই বেখবর। জীবনকে সফল, সুন্দর এবং অর্থময় করে তুলতে হলে নবী রসুলদের পথ ধরে চলতে হয়। আমাদের নবী সরওয়ারে কায়েনাত মোহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ স. এই পথেরই পথিক হবার জন্য আহবান জানিয়ে গিয়েছেন আজীবন। জানিয়েছেন 'আখেরাতের কল্যাণ ছাড়া কোনো কল্যাণ নেই
কল্যাণ লাভের জন্য দুটি জিনিস থাকতেই হবে। এর প্রথমটি বিশ্বাস। দ্বিতীয়টি কর্ম। শরীয়তের পরিভাষায় এর নাম আকিদা এবং আমল। আকিদার ক্ষেত্রে দ্বীন ইসলামের নাম নিয়ে তিয়াত্তরটি দল সৃষ্টি হবে বলে হজরত রসুলেপাক স. এরশাদ করেছেন। আরো এরশাদ করেছেন, এর মধ্যে একটিমাত্র দলই নাজাতপ্রাপ্ত দল । বাকী বায়াত্তরটি দল পথভ্রষ্ট। পথভ্রষ্ট দলগুলো হচ্ছে, খারেজী, মোতাজিলা, শিরা, কাদিয়ানী, মওদুদী ইত্যাদি। এদের মধ্যে মওদুদী মতবাদের লোকেরাই সবচেয়ে চতুর। বর্তমানে আমাদের দেশে বিভ্রান্তি প্রসারের ক্ষেত্রে এরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে। এরা আমাদের মসজিদে মাদ্রাসায় সুকৌশলে ঢুকে পড়ে কেনার ক্ষেত্র প্রসার করতে সচেষ্ট। সাধারণ সরল মুসলমানদের কেউ কেউ এদের প্রচারণায় পড়ে সত্যমিথ্যার পার্থক্য ভুলতে বসেছে প্রায়। এরা রসুলেপাক স. এর সম্মানিত সাহাবাবৃন্দের প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপকারী পণ্ডিতমূর্খ আবুল আলা মওদুদীর একনিষ্ঠ অনুসারী। অপরপক্ষে নাজাতকামী ব্যক্তিদের অনুকরণীয় আদর্শ সাহাবায়ে কেরাম রা.। হজরত রসুলেপাক স. নাজাতপ্রাপ্ত দলের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে 'আমি এবং আমার সাহাবীগণ যে দলে আছি।'
প্রকৃতপক্ষে হজরত নবীয়ে পাক স. এবং সাহাবাগণের পথানুসরণকারী ব্যক্তিগণই সত্য দলে আছেন। এই দলের নাম আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত। এরা ক্রমাগত পূর্ববর্তীগণের অনুকরণের মাধ্যমে জারী রেখেছেন দ্বীনের পরিপূর্ণ জ্ঞানার্জনের আদর্শ। বাহ্যিক জ্ঞানের (জবানী এলেম) ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যবহার। অন্তর্মানের (কলবী এলেম) ক্ষেত্রে প্রচলন করেছেন তরিকা। এই পূর্ণতার পথেই আহবান আমাদের।
