কবিয়াল বিজয় সরকার (১৯০৩-১৯৮৫) বাংলা সঙ্গীতের প্রবাদপুরুষ; গীতিকার, সরকার ও কণ্ঠশিল্পি হিসেবে সমান পারদর্শী ছিলেন। জীবদ্দশায়ই তিনি বাঙালির সঙ্গীতপিপাসা মিটিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হন। স্বাধীনতা লাভের পূর্বে কবিয়াল বিজয় সরকারের গান প্রচারিত হয়েছিলো ঢাকা, ভয়েস অব আমেরিকা ও রাওয়ালপিন্ডি বেতার কেন্দ্র থেকে। কোনও ধরনের প্রকাশনা মাধ্যমের সহযোগিতা ছাড়াই বিজয়ের গান বাঙালির অন্তরে বাসা বাঁধে। তাঁর গান ছড়িয়ে পড়েছিলো সর্বস্তরের মানুষের কাছে। বিজয়ের গান প্রসঙ্গে পল্লিকবি জসীমউদ্দীন স্বাধীনতা লাভের আগেই লিখেছিলেন, 'ছাপাখানা বা রেডিও গ্রামোফোনের সাহায্য ব্যতিরেকে বিজয়ের নতুন সুরের গানগুলি বাংলার সর্বস্তরে ছড়াইয়া পড়িতেছে।'
অতুলনীয় সঙ্গীতপ্রতিভার অধিকারী কবিয়াল বিজয়ের সঙ্গে আমি সত্তর দশকে (১৩/১০/৭৬ইং) গাঁটছড়া বাঁধি। তিনি একটি লৌকিকসম্পর্ক সৃষ্টি করে আমাকে অন্তরে স্থান দিয়েছিলেন। বেপথু হাওয়ায় ভেসে চলা আমি তাঁর নৈকট্যে জীবনের নতুন রূপরসের সন্ধান পেলাম। কবিয়াল বিজয়কে নিয়ে আমার প্রথম প্রবন্ধ দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ পায় ২৮শে ফাঃ ১৩৮৪ সন এবং তাঁকে নিয়ে আমার লেখা পুস্তিকা 'ভাটিয়ালি গানের রাজা পাগল বিজয়' প্রকাশ পায় মাঘ, ১৩৮৬ সনে। তাঁর তিরোধানের পূর্বে ও পরে আমার কয়েকখানা পুস্তক ও বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশ পায়। আমি বহু দিন তাঁর কবির দলে অবস্থান করে তাঁর কর্মময় জীবনতথ্য ও রচনা সংগ্রহ করি।
কবিয়াল বিজয় সরকারকে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক হিসেবে সবাই জানে। এক দশকের সানিধ্যে থেকে তাঁকে আমি মহাদার্শনিক হিসেবে আবিষ্কার করি। তিনি অহিংসা, মানবপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক, শালীনরুচিবোধ, শীলতা, সহানুভূতি, ঐহ্যিকআচরণ, অতিথি পরায়ণতার ব্যবহারিক উদাহরণ রেখে গিয়েছেন। বিজয় সরকার মশাই মানবিকবোধ ও দর্শন নিয়ে কোনও গ্রন্থরচনা করেন নি, তাঁর ছড়াবজ়ায়ও তেমন তা আসে নি। তাঁর মানবিক দর্শন প্রকাশ পেয়েছিলো ব্যবহারিক জীবনে। তাঁর জীবনকাহিনী লিখে রাখার জন্য তাঁকে আমি অনুরোধ করেছিলাম। তিনি প্রথমে তাতে রাজি হন নি। এটা ১৯৭৮-৭৯ সালের ঘটনা। পরে নিমরাজি হলেন। কথা হলো, তিনি বলবেন আমি তা লিখে নেব। দৃষ্টিহীনতার ও বয়সজনিত (৮০ বছরের ঊর্ধে) ক্লান্তির কারণেই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়।
