ভূমিকা
কোরানুল করিমে নানা প্রসঙ্গ দ্বারা বা নানা উপমার দ্বারা একমাত্র মানুষকেই বুঝানো হয়েছে। কোরানের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষ এবং মানুষকে চিনলেই আল্লাহকে চেনা যায়। মানুষের সর্বদিকের বর্ণনাই কোরানুল করিমে বিবৃত করা হয়েছে (সুরা রুম, ৫৮ আয়াত)। আলিফ-লাম-লাম-হে এই চার অক্ষরে আল্লাহ মানুষের সাথে আছে। লওহ মাহফুজে রক্ষিত গুপ্ত কোরান-কিতাব সাতটি নূরের ফলকে লিপিবদ্ধ আছে এবং তা মানুষের করায়ত্ব। মানুষই সে পুশিদার রক্ষিত কিতাব পাঠ করছে। খান্নাছমুক্ত পবিত্র নফসের উপরই রূহ মূর্তমান হয়ে উঠে এবং তা মানবরূপ ধারণ করে ওয়াজহুল্লাহয় পরিণত হয়। এখানে আল্লাহর কালাম হুসাইনের জলিতে প্রতিঘাত হয়ে নাতেক হচ্ছে। ইহাই আল্লাহর তরফের নাজিলকৃত কোরান, ইনছান কোরান- যা ঈমানদারগণ শ্রবণ করে ইনছানে পরিণত হচ্ছে (সুরা রহমান)। এই জন্যই সুরা নাহলের ৯৮ নম্বর আয়াতে বস্ত্রমোহ হতে বা আমিত্ব মুক্ত হয়ে তথা খান্নাছমুক্ত হয়ে কোরান তেলওয়াত করার বিধান দান করা হচ্ছে। কারণ, অপবিত্রাবস্থায় আল্লাহর সেই গুপ্ত কিতাব স্পর্শ করা যায় না তথ্য অক্ষরাতীত নুরী কোরান পাঠ করা যায় না তথা কালামুল্লাহ জহুরে আসে না। আল্লাহর কালাম কোরান খন্ডন হলে আল্লাহপাক কৈফিয়ত তলব করবে (সুরা হিজর, ৯১ আয়াত)। সুরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিলের কারণ, ইনছান কোরানকে চেনানো। সুরা আলাকের প্রথম কালাম 'ইকরা' শব্দের মুহকামাত হলো নিজকে চিনো জানো। সুরা আলাকের হাকিকত যারা জানে তারা ইহাও জানে যে, আল্লাহপাক কোরান শিক্ষা দিয়েই পরে ইনছান সৃষ্টি করছেন এবং তাঁর পাক কালাম ইনছানকে দান করেছেন (সুরা রহমান : ১-৩)। মানুষের মূল ভিত্তি পাক পাঞ্জাতন এবং পাক পাঞ্জাতনের নাস্তিই হলেন আল্লাহ। এই জন্যই আল্লাহর হাবিব মুহাম্মদ রাছুল (সাঃ)-এর নিকট প্রথমেই মানব সৃষ্টির কাহিনী বিবৃত করা হয়েছে। এবং আল্লাহ মানুষের সাথেই আছেন- একথা বার বার বিভিন্ন ভাবে কোরানের উপস্থাপন করা হয়েছে।
চিরন্তন-শাশ্বত কদিম অক্ষরাতীত নূরী কোরান যা আল্লাহর তরফ হতে নাজিলকৃত কোরান, সেই কোরানে পতিত মানুষের জন্য হেদায়েতের বাণী ঝংকারিত হচ্ছে। এই কোরান ব্যতীত পথভ্রষ্ট মানুষ কখনো মুক্তি লাভ করতে পারবে না। কাগজে সংকলিত কোরান ইনছানের কোরানেরই গাইড- যা ইনছান কোরানকে
আসরারুল কোরान
নির্দেশ করছে। পবিত্র মানবের মাধ্যমে এই মুরী কোরান তথা কালামুল্লাহ যুগে যুগে পতিত মানুষকে হেদায়েত করে চলছে। তবে খুব কম লোকই এই চিরন্তন-শাশ্বত নূরী কোরানকে চিনে এবং বিশ্বাস করে (সুরা হাক্কাহ্-৪১ ) ।
যে বিষয়ে জ্ঞান নেই সে বিষয়ে কথা বলা বা তর্ক করা অজ্ঞতা-মূর্খতার পরিচয়। আল্লাহর কালাম সেফাতি নূর এবং আল্লাহপাক তা-ই। বিষয়টি জানার আছে। বৃথা পান্ডিত্বের তর্ক করে ইসলামের তিন কুড়ি তেরটি ফেরকার জন্য। সব ফেরকায়ই কোরান স্বীকার করে এবং কোরানের তাফসির আছে, হাদিস আছে। কেউ কারো মতামত স্বীকার করে নিচ্ছে না। ভিন্ন ভিন্ন মতামতেই প্রমাণ অঙ্ক ভুল বিধায় ফল অনেক। মুসলমান জাতি নিজেদের মধ্যে দ্বন্ধ-বিভেদ, অনৈক্য, মতানৈক্য, হিংসা-বিদ্বেষের বিষবাস্পে আক্রান্ত হয়ে সব জাতির পিছনে পড়ে আছে। নিজেদের মধ্যে মারামারি, খুনাখুনি করছে, অন্য জাতির মৌলবাদীরা এর সুযোগ নিচ্ছে, উস্কে দিচ্ছে। এর মূল কারণ কোরানের মুহকামাত না বুঝে শুধু আরবী বিদ্বানগণ রূপকের অর্থ করে কোরানের কালাম প্রচার করছে, তাতে মতানৈক্য ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে; যা কোরানে নিষেধ করা হয়েছে। এই জন্য ঐক্যতায় আসতে পারছে না। রাছুল (সাঃ) বলছেন, “তোমাদের মধ্যে ঐক্যতা সৃষ্টি করা নামাজ, রোজা, সদ্কার চেয়েও উত্তম (তিরমিজি) ”। যদি কোরানের মুহকামাত বুঝতো তবে ফলাফল একটিই হতো, আর তা হলো মানুষ। কোরান বলছে, 'আমি বিভিন্ন প্রসঙ্গ দ্বারা মানুষকেই বুঝিয়েছি'। কাজেই আল্লাহর নাজিলকৃত কোরান কালামুল্লাহ্ এই মানুষ হতেই এবং এই মানুষই (ইনছানি আত্মার অধিকারী) আল্লাহর মতলেক কালামের প্রকাশক কোরানুন নাতেক তথা বাঙময় কোরান।
এই ছোট বইটিতে আমি সেই আল্লাহর তরফের নাজিলকৃত ইনছান কোরানের সামান্য পরিচয় তুলে ধরে বুঝাতে চেষ্টা করেছি এবং নাম দেয়া হয়েছে 'আসরারুল কোরান”। আল্লাহর কালাম নূর, কদিম- তা অক্ষরাতীত। এর লয়, ক্ষয়, ধ্বংশ বা পরিবর্তন নেই। নূরী কোরানকে সব মানুষেরই চেনা-জানা প্রয়োজন। মানব মুক্তির সব কথাই আল্লাহ কোরানের মাধ্যমে প্রকাশ করছেন। যে আল্লাহর কালামকে ধারণ করেছে, সে মানুষ দোযখী হবে না, দোযখের আগুন তাকে কখনো স্পর্শ করবে না।
কাজী বেনজীর হক চিশতী নিজামী