ইতিহাস জানে না, মানুষ কবে এই ধূলির ধরায় এসেছে। এ সম্বন্ধে অনন্ত শাস্ত্র অনন্ত কাহিনী। ফেরেশতার (দেবতার) মারফত মানুষ শিখেছে তার কর্তব্য, ঐহিক এবং পারত্রিক। কত কোটি কোটি যুগ ধরে, মানুষ তার সুখ সুবিধার সন্ধানে চলেছে, অনন্ত যাত্রায় অনন্তের পথে। বসবাসের জন্য মানুষ গড়েছে আকাশচুম্বি সৌধ, যাতায়াতের জন্য কত যানবাহন। আজ মানুষ গ্রহ হতে গ্রহান্তরে যেতে ব্যস্ত। এ জয়যাত্রার অন্ত নেই।
অবশ্যম্ভাবী মরণের পরপারে কল্পনায় গড়েছে মানুষ সোনার সৌধ, উপভোগ্য কত কি মনোরম বস্তু ও দৃশ্য। আবার এঁকেছে শাস্তির বিভীষিকাপূর্ণ চিত্র। এই ভীতি ও প্রলোভনের পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে উঠেছে মানব কল্যাণের হেতু, ধর্মপথ। এই ধর্মপথের কত রূপ দিয়েছে মানুষ। অনন্ত ধর্মের অনৈক্য স্বীকারের মতভেদ নিয়ে, সমাজ গড়ে নিয়ে, যার যার মতো শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্নের দাবিতে, সাধারণ মানুষ পরস্পর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, ঝগড়া-দ্বন্দ্ব, মারামারি, রক্তারক্তি ও কলহের অভিনয়ে ব্যস্ত। চিন্তা করলে হতবুদ্ধি হতে হয়।
মানবজগৎ রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ও ধর্মনীতির বন্ধনে সু- নিয়ন্ত্রিত । এই নীতি চতুষ্টয়ের মর্ম ও উদ্দেশ্য হৃদয়ঙ্গম করে, যাহারা এই নশ্বর জীবনের কর্তব্য নির্ধারণ করেছেন, তাঁরাই আদর্শ মানব । বাংলার ধূলি ধূসরিত পল্লীবক্ষে কত আদর্শ মানুষ জন্মেছেন এবং অনন্ত যাত্রাপথে গমন করেছেন তার অন্ত নেই। বাংলার লোককবিরা রেখে গেছেন প্রাণের চিন্তাধারা, পল্লীগীতি হিসাবে, সরল মাতৃভাষায়। দুঃখের বিষয় এদের গীতিগুলো এবং জীবনী জনশ্রুতি হিসাবেই স্মৃতি বহন করে আসছে মাত্র। পাশ্চাত্য জগতের
ইতিহাসেরও অজানা সেই আদিম যুগের মানুষের ধর্ম, আলেমুল- গায়েব খোদাতালাই জানেন। কেতাবি ধর্মের আমল হতে ধর্মের অনন্ত ইতিহাস, কেতাব, প্রমাণিত হয়ে আসছে। বিজ্ঞ সমাজ কারো অজানা নেই। অনন্ত কেতাব শাস্ত্র ইত্যাদিতে অনৈক্য স্বীকার ও মতভেদ বিদ্যমান। জ্ঞান-বিজ্ঞানে গর্বিত উন্নত মানুষ বসবাসের সুবিধার সন্ধানে গড়েছে আকাশচুম্বী সৌধ, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে যেতে ব্যস্ত। মরণের পরপারের স্বপ্ন রচনা একদিকে সোনার সৌধ, অপরূপ-রূপলাবণ্যবতী কুমারী, নানা প্রকার রসনাতৃপ্তকর খাবার-অন্যদিকে ভয়াবহ শাস্তির চিত্র।
পবিত্র কালাম পাক উদারনৈতিক ধর্মগ্রন্থ কোরান মানুষের চিন্তাধারার স্বাধীনতা দিয়েছে-
"ওয়ান জালনা এলায়কাল জেকরা লে-তু-বাইয়েনা লে-নাছে মানজ্জেলা এলায়হেস অ-লায়াল্লাহোম তাফাক্কারুন" (সুরা নহল) অর্থ- “আমি তোমার উপর কোরান নাজিল করিয়াছি এইহেতু যে তুমি মানুষকে ইহার মর্ম জানাও এবং মানুষ ইহার প্রকৃত মর্ম অবগতির জন্য চিন্তাশীল হউক”।
এই চিন্তাই মানবের বৈশিষ্ট্য। চিন্তাশীল মানব যুগে যুগে জীবন সমস্যা নিয়ে নড়াচাড়া করছে। যখনই চিন্তাধারা বহির্জগৎ হতে ঘুরে অন্তর্মুখীন হয়েছে এবং আত্মা কি, মন কি, জীবনের পরপারে কি আছে-এই সকলের সমাধানে নিয়োজিত হয়েছে। এ সমস্ত বিষয় আস্তিক যা ধারণা করে নাস্তিক তা করে না। বৈজ্ঞানিক যে বিশ্বাস নিয়ে বসে আছে সরল বিশ্বাসী ভাবুকের বিশ্বাস তদ্রূপ নয়। যারই চিন্তাশক্তি আছে, সেই কোনো না কোনো মীমাংসায় আস্থা স্থাপন না করে থাকতে পারে না। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো প্রকারের একটা বিরাট সত্ত্বা, জগতের এবং তথা নিজ কারণ স্বরূপ ধরে নিয়ে তবে নিশ্চিন্ত আছে। কেউই নিজের ক্ষুদ্র শক্তির ওপর আস্থা স্থাপন করে থাকতে পারে না। এই যে আপনার অপেক্ষা বৃহত্তর কোনো সত্তাকে অবলম্বন স্বরূপ হৃদয়ে ধারণ ও তাতে নির্ভর স্থাপন করা, এটাই মানুষের অন্তরের ধর্ম ।