সম্পাদকের কথা
দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয় বাউল সাধক শাহ আবদুল করিম। ভাটিবাংলার হাওড় এলাকার জল-হাওয়া- মাটির গন্ধ আর কালনী নদীর তীরবর্তী জন-মানুষের সুখ-দুঃখ, দারিদ্র্য-বঞ্চনা, জিজ্ঞাসা, কৃষিভিত্তিক সমাজের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বিশ্বাস, লোকাচার, স্মৃতি - বিস্মৃতি প্রভৃতি তাঁর গানে এক বিশিষ্ট শিল্প মাধুর্যে প্রতিভাত হয়েছে।
পিতামহের চাচাতো ভাই ফকির নসিব উল্লাহর সংস্পর্শে করিমের শিশুমন দারুনভাবে প্রভাবিত হয়। বলা যায়, তাঁরই কাছে বালক করিমের সংগীতে হাতেখড়ি। আবহমান কাল থেকেই হাওড়াঞ্চল বিভিন্ন ধরনের গানের সূতিকাগার। সেই শ্রেভধারায় শৈশব থেকেই করিষ গানের দিকে ঝুঁকে পড়েন। নানা টানাপোড়েনে করিম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। পড়াশুনা বলতে নৈশবিদ্যালয়ে মাত্র আট রাতের অভিজ্ঞতা। কিন্তু জীবনকে দেখার নভীর এবং প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিপাতের কারণেই সম্ভবত তিনি রাখাল বালক থেকে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম হতে পেরেছিলেন। মানুষের প্রতি অকৃত্রিম দরদ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁর চিন্তাকে, সংগীতকে ঘিরে আছে। আজন্ম বঞ্চনার মাঝে বেড়ে ওঠা শাহ আবদুল করিম গণমানুষের অধিকারে আদায়ে ছিলেন দারুণভাবে সোচ্চার। একপর্যায়ে তিনি লেখেন:
*মানুষের দুঃখ দেখে কাঁদে মনপ্রাণ,
মানুষকে ভালোবাসি গাই মানুষের গান'
তত্ত্বমানের পাশাপাশি তিনি দেশের গান, মানুষের গান, মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা থানে থানে তুলে ধরেছেন। শাহ্ আবদুল করিমের জীবদ্দশায় তাঁর লেখা নিয়ে ৬টি বই প্রকাশ পেয়েছে— আঙ্কতাৰ সংগীত, গণসঙ্গীত, কালনীর ঢেউ, ধলমেলা, ভাটির চিঠি ও কালনীর কূলে। ১৯৮১ সালে তৃতীয় বই কালনীর ঢেউ প্রকাশ করতে শেষ সম্বল না বিঘা (তিন একর) জমি বিক্রি করতে হয়েছিল তাঁকে। পরবর্তীতে যখন বসতবাড়ি ছাড়া বিক্রি করার মতো তার কিছুই ছিল না, তখন তিনি প্রায়ই
বলতেন-
"আমার তো বই ছাপা করার মতো আর কোনো সম্বল নাই, তাহলে কেউ যদি আমার কালনীর ঢেউ পড়ে আর ভাটার চিঠি ও গণসঙ্গীত বই দুটি না পড়ে, তাহলে
শাহ আবদুল করিম : জীবন ও সংগীতসমগ্র ॥ ১৫
শাহ আবদুল করিমের জীবন ও কর্ম
মরমি ধারার আধুনিক লোক ও চারণ কবিদের অন্যতম বাউল শাহ আবদুল করিম। তিনি ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯১৬ সালে বাংলা ১৩২২ সনের ফাল্গুন মাসের প্রথম মঙ্গলবার ব্রিটিশ ভারতের সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ মহকুমার দিরাই থানার বল আশ্রম গ্রামে এক গরিব কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাদীক্ষার অভাব ও পারিবারিক রেওয়াজ না থাকায় বর্ষপঞ্জিকা অনুযায়ী শিশু করিমের জন্মতারিখ তখন সুনির্দিষ্ট করে কেউ লিখে রাখেনি। শত শত বছর ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী পরমেশ্বরী দেবীর মেলা (পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের প্রথম বুধবার হিন্দুদের দেবী পরমেশ্বরী পূজা উপলক্ষ্যে মেলা) কথিত ধল মেলার আগের দিন মঙ্গলবার ছিল তাঁর জন্মদিন। এ কথা তাঁর মা নাইওরজান বিবির কাছে শোনা। বাউল করিমের জন্মতারিখ নিয়ে নিজ বক্তব্য:
তেরশো বাইশ বাংলায় জন্ম আমার !
মা বলেছেন ফাল্গুন মাসের প্রথম মঙ্গলবার
বাউল করিমের পিতার নাম- ইব্রাহীম আলী এবং মাতার নাম- নাইওরজান বিবি। তীব্র দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে করিম জন্ম নেন। পারিবারিক দরিদ্রতার মধ্যে বেড়ে ওঠা করিম ছোটোবেলারই বুঝতে পারেন অভাব ও সামাজিক প্রতিকূলতা কী জিনিস! তাই তিনি লিখেন:
পিতা-মাতা রেখেছিলেন আবদুল করিম নাম ।
জানি না কেন যে বিধি হল বাম ॥
ইব্রাহীম আলী ও নাইওরজান বিবির ছয় সন্তানের মধ্যে করিম ছিলেন প্রথম সন্তান ও একমাত্র পুত্র। অন্য সন্তানরা অর্থাৎ করিমের ছোটো বোনেরা ছিলেন ছাওধন বিবি, রাফিক বিবি, মালা বিবি, ফুলজান বিবি ও ফুলবাহার বিবি। তাঁর পিতামহের নাম ছিল নঈম উল্লাহ। নঈম উল্লার ভাই ছিলেন নসিব উল্লাহ। তাঁর প্রত্যক্ষ প্রেরণায় করিয় বেড়ে ওঠেন। নসিব উল্লাহ সম্পর্কে দাদা এবং ফকিরী সাধনায় ছিলেন সিদ্ধপুরুষ। তাঁকে নিয়ে করিম বলেছেন:
জন্য নিয়ে একজনের সান্নিধ্য পাইলাম। পিতামহের ছোট ভাই নসিব উল্লাহ নাম ফকির ছিলেন করতেন সদা আল্লাহর জিকির। ফকিরি বিনে ছিলনা অন্য ফিকির ।
: জवन ও গীতসম ॥ ১৭