কেবলমাত্র দুটি জীবের সঙ্গে তথা দুইটি নসের কাছাকাছি অতীব সূক্ষ্মরূপে অবস্থান করে। সেই দুইটি জীবের নাম হলো একটি জিন এবং অপরটি মানুষ। যেহেতু আমাদের কাজ-কারবার মানুষদের নিয়েই সেই হেতু ইচ্ছা করেই জিন জাতিকে এড়িয়ে যাই। তা ছাড়া কোরান এই মানুষকেই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব (ক্রাউন অব দ্য ক্রিয়েশন) বলে ঘোষণা করেছেন। এর পরেও আরও কিছু কথা থাকে আর সেই কথাটি হলো, শয়তানকেও আল্লাহ্র সমগ্র সৃষ্টিরাজ্যের মধ্যে জিন এবং মানুষের অন্তরে অবস্থান করার আদেশটি আল্লাহ্ কর্তৃক দেওয়া হয়েছে। আমাদেরকে ভালো করে মনে রাখতে হবে যে জিন এবং মানুষের অন্তর বিহনে আর কোথাও শয়তানকে অবস্থান করার অনুমতিটি দেওয়া হয় নাই। সুতরাং, শয়তানের যত বাহাদুরি, যত নর্তন-কুর্দন সব কিছু এই জিন এবং মানুষের অন্তরের মধ্যেই অবস্থান করে। জাগতিক সভ্যতার বিকাশ ঘটানোর পেছনে এবং ধ্বংসের বিভীষিকা ছড়ানোর পেছনে শয়তানের অবদান কতটুকু তা আমাদের জানা নাই। এই শয়তান আবার চারটি রূপ ধারণ করতে পারে। এবং এই চার রূপের যে-কোনো রূপ ধারণ করে মানুষকে সঠিক পথ হতে সরিয়ে দিয়ে ভ্রান্ত পথে ঠেলে দেয়। সেই চারটি রূপ হলো : এক. শয়তান, দুই. ইবলিস, তিন. মরদুদ এবং চার. খান্নাস। যেহেতু মিন শাররিল্ ওয়াসওয়াসিল খান্নাস' তথা খান্নাসের অপকারিতা হতে আশ্রয় চাওয়ার কথাটি কোরান-এ বলা হয়েছে তাই পবিত্র নফস তথা প্রাণ তথা জীবনের সঙ্গে একত্রে বাস করে নসটিকে খান্নাস-রূপী শয়তান মোহ-মায়ার জালে আটকিয়ে রাখে। এই মোহমায়ার জালটিকে ছিন্ন করতে পারলেই নসের নিকট যে-রুহ অতীব সূক্ষ্ম রূপে অবস্থান করছে উহা তখন পরিপূর্ণ রূপ ধারণ করতে থাকে। সাধকেরা একটানা ধ্যানসাধনা করার পর আল্লাহ্র বিশেষ রহমতপ্রাপ্ত হলেই রুহের অতীব সূক্ষ্ম রূপটিকে পরিপূর্ণরূপে দেখতে পেয়ে অবাক বিস্ময়ে হতভম্ব খেয়ে যায়। এই পরিপূর্ণতার প্রশ্নে সাধকদের নিকট রুহের দর্শনে ফানা-বাকার এমন রহস্যময় লীলাখেলা চলে যে সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক, বরং বড়-বড় বিদ্বান পণ্ডিতেরাও এদের বিষয়ে খেই হারিয়ে ফেলে। রুহের পরিপূর্ণ জাগ্রত অবস্থানটি যে-সাধকের মধ্যে অবস্থান করে তিনিই বান্দানেওয়াজ তথা আল্লাহ্র বিশেষ রহমতপ্রাপ্ত বান্দা। তিনিই রুহুল্লাহ তথা পরিপূর্ণ রুহের অধিকারী। তিনিই ওয়াজহুল্লাহ্ তথা, তিনিই আল্লাহ্র চেহারা। তিনিই নরের রূপে নারায়ণ তথা নরনারায়ণ । আল্লাহর এই দানটি একমাত্র শক্তিশালী রাত্রিতে দান করা হয়। ইহা কোনো নৈসর্গিক রাত্রি নহে, বরং আধ্যাত্মিক রাত্রি। নফস এবং খান্নাস জোড়া হলে এই শক্তিশালী রাত্রির সন্ধান পাওয়া যায় না। তাই খান্নাসকে
মস এবং রুহের সূক্ষ্ম পার্থক্যটি সর্বপ্রথম খুব ভালো করে বুঝে নিতে হবে। এই বিষয়টি এতই নাজুক এবং এতই সূক্ষ্ম ও নিখুঁত যে ইহার আদ্যোপান্ত ভালো করে বুঝে নিতে না পারলে নফস এবং রুহের লাবড়া পাকানো হয়ে যায় এবং এই লাবড়াই সাঙ্ঘর্ষিকরূপে প্রতি পদে ধরা দেয়। সামান্য একটু চিন্তা করলেই দেখা যায় যে, 'কুল্লু রুহিন জায়েকাতুল মউত'— তথা, 'প্রত্যেক রুহ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে—এমন একটি আয়াতও কোরান-এর কোথাও নাই; আছে, 'কুল্লু নাফসুন জায়েকাতুল মউত'—তথা, প্রত্যেক নফস মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। যেহেতু মৃত্যুর স্বাদ মাকেই গ্রহণ করে নিতে হবে সেই হেতু নফসের ভালো-মন্দের জন্য মাগফেরাত কামনা করা যায়; অথচ রুহের যেহেতু মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করার প্রশ্নই ওঠে না সেই হেতু রুহের মাগফেরাত চাওয়াটি বিরাট একটি সাজার্ষিক বিষয়। এই বিষয়টিরই বিশদ ব্যাখ্যার জন্য কোরান-এ যতবার রুহ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে ততবার ইহার হুবহু অনুবাদ ও সামান্য ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। পাঠকেরা বিষয়টি মনোযোগ সহকারে পড়লেই পরিষ্কার বুঝতে পারবেন।
নস শব্দটি দিয়ে প্রাণকেই বোঝানো হয়েছে। যদিও হিন্দুশাস্ত্রে নসকে আত্মাই বলা হয়েছে তবে জীবের আত্মা বলা হয়েছে। এই নস তথ্য প্রাণ কেবলমাত্র জিন এবং মানুষের মধ্যেই দেওয়া হয় নি, বরং স্থলচর, জলচর, সর্বপ্রকার অতি ক্ষুদ্র হতে অতি বড় জীব—সবারই নস আছে তথা প্রাণ আছে। আরেকটু প্রশ্ন থেকে যায় যে, বৃক্ষ হতে তরু- লতারও প্রাণ আছে। এবং যে কঠিন ছোট-ছোট পাথরগুলো আস্তে-আস্তে প্রকাণ্ড পাথরে পরিণত হয় উহাতে কি প্রাণ আছে? নাকি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনা-আপনি বেড়ে চলে? এই প্রশ্নটির উত্তর জীববিজ্ঞানীরাই ভালো দিতে পারবেন। তবে আল্লাহ্র সমগ্র সৃষ্টিরাজ্যের মাঝে যাদেরকে নফস তথা প্রাণ দেওয়া হয়েছে তারা সবাই তৌহিদে বাস করে—একমাত্র জিন এবং মানুষ ছাড়া। কারণ, জিন এবং মানুষকে সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিটি দান করা হয়েছে। তথা ভালো-মন্দ বিচার-বিবেচনা করার সীমিত স্বাধীন ক্ষমতাটি। আহ্ কর্তৃক দান করা হয়েছে। অন্যথায়, আমাদের জানা মতে আর কোনো জীবকেই এই রকম সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিটি দেওয়া হয় নাই। স্বার এবং জলচর যত প্রকার অসংখ্য ছোট এবং বড় প্রাণী আছে তাদের মারফতের গোপন ভেল-রহস্য-২
