তাঁহাদের এই আগমন নূর মোহাম্মদের বিশেষ রহমতরূপে আগত; কেননা নূর মোহাম্মদ হইলেন বিশেষ
শ্রোতা, বিশেষ জ্ঞানী।
৭৮. মনোজগৎ ও জড়জগৎ এবং এই দুইয়ের মধ্যবর্তী যত প্রকার জগৎ আছে তাহার সর্বত্রই তিনি রবরূপে অবস্থিত। রবরূপে নূর মোহাম্মদের পরিচয় কেবল প্রত্যয়শীলদেরই হইয়া থাকে। আত্মবিশ্বাসে দৃঢ় না হইলে কেহ কখনও আপন রবরূপে নূর মোহাম্মদের পরিচয় লাভ করিতে
পারিবেন না ।
রবরূপে তাঁহার যে অস্তিত্ব তাহাই শুধু মানুষের উপাস্য। এই উপাস্য রব ভিতরে ও বাহিরে উভয় অবস্থায় স্বল্পস্থায়ী। ছোট মদদ্বারা এই ইঙ্গিত বহন করিতেছে। ব্যক্তিরব যদিও স্বল্পস্থায়ী কিন্তু সর্বযুগের সকল মানুষের জন্যই তিনি রবরূপে অস্তিত্বমান হইয়াই আসিতেছেন। এই কথাটি বড় মদদ্বারা ব্যক্ত করা হইয়াছে। রবরূপেই তিনি জীবন ও মরণদান করেন। যখন তিনি জীবের ভিতর হইতে চলিয়া যান তখনই তাহার মৃত্যু ঘটে ।
৯. জনগণ বাহিরের রবের খবর না লইয়া জাগতিক ক্রীড়া-কৌতুকে মত্ত থাকিয়া ভিতরের রব হইতেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হইয়া থাকে। গুরু ব্যতীত কেহই তাহাদিগকে রবের সংযোগদান করিবে
১০–১১. 'দোখান' অর্থ ধোঁয়া অর্থাৎ মনের উপর অজ্ঞানতার আবরণ। এই বাক্যটি হইতে এই সুরার নামকরণ করা হইয়াছে। মনের উপর দীর্ঘ মদ রহিয়াছে। মন অনন্তকাল জন্মমৃত্যুর মধ্যে আবর্তিত হইতেছে। মৃত্যুর পর যখন সে আদি অবস্থায় পুনর্জন্মে আসে তখন তাহার চিত্তাকাশ হইতে তথা মন হইতে সকল জীবনস্মৃতি মুছিয়া ফেলা হয়। যখন সে নবজন্মে আসে তখন তাহার চিত্তাকাশ ধূম্রাচ্ছন্ন থাকে। অর্থাৎ মনের পূর্বস্মৃতিসমূহ সকলই আচ্ছন্ন হইয়া পড়ে, কিছুই তাহার মনে থাকে না। অতএব, ক্রীড়া-কৌতুকে মত্ত থাকিয়া আপন রব হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া জীবনযাপন করিলে বারংবার চিত্তাকাশের অবস্থা ধূম্রাচ্ছন্ন হইয়া পড়ে। অজ্ঞানতার মধ্যে বারংবার জন্মলাভ করা মানুষের জন্য যন্ত্রণাদায়ক একটা শাস্তি। সুতরাং, আপন রবের দ্বারস্থ হইয়া এই অবস্থা হইতে মুক্তিলাভের উপায় অর্জন করিবার জন্যই এই বাক্যটি সাবধান বাণীরূপে প্রকাশ করা হইয়াছে।
১২. সম্যক গুরুর শিষ্যগণ নিজদিগকে মোমিন বলিয়া মনে করে, তাই তাহারা পার্থিব সকল অশান্তি হইতে গুরুর নিকট মুক্তির আবেদন করিতেছে। তাহারা জাহান্নামের ধূম্রাচ্ছন্ন অবস্থায় পুনরায় না যাইয়া যাহাতে জান্নাতের এলহামের সংযোগ দ্বারা অজ্ঞানতার সকল আবরণ ও পরিবেশ সরাইয়া ফেলিতে পারে তাহার জন্য প্রার্থনা জানাইতেছে।
১৩–১৪. জনগণের দিকে লক্ষ্য করিয়া বলিতেছেন: তাহাদের গুরু-সংযোগ কোথায়? সর্বযুগেই তাহাদের নিকট এক একজন রসুলের আগমন হইতেই আছে কিন্তু তাহারা তাঁহাকে ভূতগ্রস্ত অপবাদ দিয়া তাঁহা হইতে মুখ ফিরাইয়াছিল ।
১৫. যাহারা গুরুর শিষ্যরূপে অজ্ঞানতার শাস্তি অপসারণ প্রার্থী (১২ নং বাক্য দ্রষ্টব্য) তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলা হইতেছে : “নিশ্চয় আমরা তোমাদের অজ্ঞানতার শাস্তিটি কিছু কমাইয়া দিই কিন্তু তোমরা ত অসীম আবর্তনকারী।” ‘অসীমভাবে আবর্তনকারী' অর্থ তাহারা মুক্তিমুখী নহে, বরং স্বর্গমুখী।
১৬. জাহান্নামবাসী হউক অথবা জান্নাতবাসী হউক ইহাদের সবাইকে এক সময় মৃত্যু দ্বারা শক্ত মুষ্টিতে ধরা হয় এবং পুনর্জন্মে পাঠাইয়া কর্মফলের যথাযোগ্য পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
১৭–২১. মুক্তির জন্য গুরুর দ্বারস্থ হওয়া যে অবশ্য কর্তব্য, তাহা ব্যক্ত করিবার পর এই বিধানের
প্রতি অবাধ্যতার পরিণামের একটি দৃষ্টান্তস্বরূপ ফেরাউনের কাওমের উল্লেখ করা হইতেছে। কোরানে
২৯. ফেরাউনের কাওমের মতো বস্তুবাদী দুনিয়ামুখী লোকের জন্য তাহাদের মৃত্যুতে আল্লাহর সলভুক্ত লোকেরা ক্রন্দন করেন না। অর্থাৎ কোনও সহানুভূতি রাখেন না। আল্লাহর পক্ষ হইতে তাহাদের প্রতি মজর দেওয়াও হয় না। নজর দেওয়া অর্থ মুক্তির দিকে আগাইয়া দেওয়া। অসীম মনোলোক বলিতে আল্লাহর দলভুক্তগণের মনোজগৎকে বুঝায়। যাহারা জাহান্নাম ত্যাগ করিবার উদ্দেশ্যে মুক্তিমুখী হয় না, আল্লাহ তাহাদের প্রতি নজর দিতে পারেন না, যেহেতু তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ – কাহারও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির উপর হস্তক্ষেপ করেন না।
৩০–৩১. অপরপক্ষে যাহারা সারাজীবনের জন্য অনস্ত ইসরাইলের পুত্র হইয়া থাকেন তাহাদিগকে সকল যুগেই আল্লাহ উদ্ধার করিয়া থাকেন — যেমন উদ্ধার করিয়াছিলেন মুসা নবির শিষ্যগণকে ফেরাউনের অবমাননাকর শাস্তি হইতে । এইখানে আল্লাহ নিরপেক্ষতার ভূমিকা গ্রহণ না করিয়া স্বীয়দলের পক্ষে সাহায্যকারীর ভূমিকা গ্রহণ করেন। মুসার (আ) মতো একজন মহাপুরুষের অনুসারী শিষ্যগণ যেমন অনন্ত ইসরাইলের পুত্র হইয়া থাকেন তেমনই অনস্ত মোহাম্মদের পুত্রগণ আলে-মোহাম্মদ নামে আখ্যায়িত হইয়া থাকেন। উভয় কথাই একাকার। বৃত্তির অপচয়কারীদের মধ্যে ফেরাউন ছিল একজন বড় অপচয়ী । মানবীয় বৃত্তিকে আল্লাহর পথে ব্যয় না করিলে তাহাকে অপচয়ী (মোশরেফ) বলে ।
৩২–৩৩. আত্মপরিচয়জ্ঞানে ইসরাইল পুত্রগণ সকল মানবগোষ্ঠী হইতে অগ্রগামী ছিল। তাই তাহারা আল্লাহর পরিচয়জ্ঞানে জ্ঞানী ছিল। এইজন্য আল্লাহর সেবাকর্মের জন্য ইসরাইলদিগকে আল্লাহর মনঃপূত দল হিসাবে বাছিয়া লওয়া হইয়াছিল।
'বালা' অর্থ আপদ । এইখানে 'বালা' শব্দের উপরে দীর্ঘ মদ আছে। ইহার অর্থ বস্তুবন্ধনজনিত অসীম আপদ। আল্লাহ 'লা' এর মধ্যে বাস করেন। সাধক যখন আত্মবিশ্লেষণের দ্বারা আল্লাহর পরিচয় লাভ করেন তখন তিনি লা-তে পৌঁছিবার মনোভাব গ্রহণ করেন এবং আল্লাহ লাভের পথে অসীম বস্তুবন্ধনকে বিঘ্ন বা আপদরূপে দেখিতে পান। মুক্তিপথে এই পর্যায়ের যাত্রীগণকে বস্তুবাদী সমাজ অপ্রিয় এবং আপদরূপে গ্রহণ করে। সেই কারণে তাঁহাদের জীবন আপদগ্রস্ত হয়
৩৪–৩৬. এই তিনটি বাক্যে কোরেশদের জীবন দর্শনের স্বরূপ বর্ণনা করা হইয়াছে। তাহাদের বিশ্বাস করে যে, পূর্বজন্ম হইতে উত্থিত হইয়া তাহারা বর্তমান জন্মে আসে নাই এবং তাহাদের আসন্ন মৃত্যুও প্রথম মৃত্যু ব্যতীত নহে। এবং আসন্ন মৃত্যুর পরে আবার উত্থিত হইবে না। তাই পুনরুত্থানে যাহারা বিশ্বাসী তাহাদিগকে চ্যালেঞ্জ করিয়া তাহারা বলিতেছে : “যদি তোমরা সাদেক (অর্থাৎ সত্যাশ্রয়ী) হইয়া এই কথা বলিয়া থাক তবে আমাদের পূর্বপুরুষদিগকে তোমাদের সঙ্গে আনিয়া দেখাও।”
৩৭. কোরেশদের চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতে তুব্বা সম্প্রদায়ের উল্লেখ করিয়া বলা হইতেছে যে, তাহারা কোরেশ সম্প্রদায়ের চাইতে জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও ধন-সম্পদে অধিক উন্নত জাতি ছিল। কিন্তু তাহারা পাপী ছিল বলিয়া তাহাদিগকে ধ্বংস করিয়া দেওয়া হইয়াছিল।
৩৮–৩৯. দেহ-মন সমন্বিত মানুষ সৃষ্টি, একটি বিশেষ রহস্যময় সৃষ্টি। উচ্চতম পর্যায়ের জীবের মধ্যে আল্লাহ তাঁহার আপন পরিচয়দান এবং বিকাশ সাধনের জন্যই দেহ মনকে ক্রমবিকাশের দিকে
আগাইয়া নিতেছেন।
দেহ জড় পদার্থ। ইহার সঙ্গে মনের সংযোগ সাধনের দ্বারা ইহা জীবন্ত ও জাগ্রত হইয়া ওঠে। নিম্নমানের জীবকে ক্রমোন্নতিদান করিয়া তাহার মনকে উচ্চ পর্যায়ে না আনিলে আল্লাহর পরিচয় গ্রহণে সক্ষম হয় না। মধ্যবর্তী জীবগুলিকেও পরম উন্নতির দিকে ক্রমশ ধাবিত করিতেছেন। সৃষ্টির এই আবর্তন সত্যের সহিত বিজড়িত রহিয়াছে; মিথ্যা ক্রীড়া-কৌতুকের জন্য ইহা নহে। সাধারণ মানুষ সৃষ্টি রহস্যের এই বিষয়টি মোটেই অবগত নহে।
কোরান দর্শন - ১- সূচি
সাঙ্কেতিক অক্ষরসমূহের পরিচয় --------------------- ৯
শব্দ সংজ্ঞা --------------------- ১৮
১. সূরা ফাতেহা ---------------------- ৩৫
২. সূরা বাকারা ------------------------ ৩৯
৪. সূরা নিসা ----------------------- ১৬৩
৬. সূরা আনাম ------------------------- ২৭৭
৭. সূরা আরাফ -------------------------২৭৩
৮. সূরা আনফাল ---------------------------৩৪২
৯. সূরা বারাত --------------------------৩৬৮
আল কোরান সম্বন্ধে একটি মন্তব্য -------------------------৪১৬
কোরান দর্শন - ২ - সূচি
কোরানের নামকরণ ------------------------------ ৯
১৩. সুরা রাদ ---------------------------- ১৩
১৫. সুরা হিজর --------------------------- ৩০
১৮. সুরা কাহাফ --------------------------- ৬০
১৯. সুরা মরিয়ম --------------------------- ১২২
২৮.সুরা নূর --------------------------- ১৫৩
২৫.সুরা ফুরকান --------------------------- ১৪১
২৯. সুরা আনকাবুত ---------------------------- ২১৮
৩৫. সুরা ফাতির ---------------------------- ২৪০
৩৬.সুরা ইয়াসিন ---------------------------- ২৫৫
৩৭.সুরা সাফফাত ----------------------------- ২৯৮
৪০.সুরা মোমিন --------------------------- ৩৩০
৪১.সুরা হা-মীম আশ সাজদা --------------------------- ৩৫২
৪২.মুরা রা ---------------------------- ৩৭০
৪৩.সুরা জোথরু ----------------------------- ৩৯৩
মোৰাহেলা ---------------------------- ৪১৪
কোরান দর্শন - ৩ - সূচি
ক্রমিক সুরার নাম সুরার ক্রমিক নং পৃষ্ঠা
১. সুরা দোখান (88) 0৭
২. সুরা জাসিয়া (৪৫) ১৮
৩. সুরা আহক্বাফ (৪৬) ৩০
৪.সুরা মুহাম্মদ (৪৭) ৪৭
৫. সুরা ফাতাহ্ (উদঘাটন) (৪৮) ৬৫
৬.সুরা কাফ (50) ৭৮
৭. সুরা তুর (৫২) ৯৫
৮. সুরা নজম (৫৩) ১০৭
৯. সুরা কামার (৫৪) ১১৯
১১.সুরা ওয়াকেয়া (৫৬) ১৪৮
১২. সুরা হাদীদ (৫৭) ১৬২
১৩. সুরা হাশর (৫৯) ১৭৫
১৪. সুরা জু'মা (৬২) ১৮৮
১৫.সুরা মূলক (৬৭) ১৯৯
১৬. সুরা মা'রেজ (৭০) ২১০
১৭.সুরা নূহ (৭১) ২২০
