দীনহীন' শব্দবন্ধটি বাউলগানের ভণিতায় আমরা প্রায়শই শুনতে পাই। দীনহীন রচিত গান বেশ জনপ্রিয়ও বটে। 'আইজ পাশা খেলব রে শ্যাম'সহ তাঁর কিছু গান রীতিমতো আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে গত কয়েক দশক ধরে কিছু ব্যক্তি অন্যায্যভাবে দীনহীনের প্রকৃত নাম, ধাম ও পরিচিতি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ নিয়ে ইতোমধ্যে বেশ বিতর্ক, সমালোচনা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
১. 'আইজ পাশা খেলব রে শ্যাম' এটির পঙ্ক্তিগুলো এ রকম:
আইজ পাশা খেলব রে শ্যাম তোমার সনে একেলা পাইয়াছি তরে এই নিগুর বনে আইজ পাশা খেলব রে শ্যাম ।
একেলা পাইয়াছি হেথা, পলাইয়া যাবে কোথা ঘিরিয়া লইব আমার সব সখিগণে আইজ পাশা খেলব রে শ্যাম ।
আতর গোলাপও চন্দন মারো বন্দের গায়ে ছিটাইয়া দেও চোয়া চন্দন ওই রাঙা চরণে আইজ পাশা খেলব রে শ্যাম ।
দীনহীন আর যাব কোথায় বন্ধুর চরণ বিহনে রাঙাচরণ মাথায় নিয়ে কান্দে দীনহীনে আইজ পাশা খেলব রে শ্যাম ।দীনহীনের' (১৮৫৪-১৯২০) বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার স্নানঘাট গ্রামে। তাঁর আসল নাম শাহ মুনশি জহির উদ্দিন। দীনহীন নামে তিনি অসংখ্য গান রচনা করেছেন। দীনহীন শব্দের অর্থ অত্যন্ত দরিদ্র বা অতিশয় নিঃস্ব। বাউল বা ফকিরি গানে আলোচ্য পদকর্তা নিজেকে আড়াল করতে কিংবা বিনয় প্রকাশ করতে 'দীনহীন' নাম ধারণ করেছেন। মূলত শাহ মুনশি জহির উদ্দিনই 'দীনহীন' নামে গান লিখেছেন। ১৯৫৬ সালে দীনহীন সঙ্গীত' প্রথম খণ্ড নামে তাঁর একটি গানের সংকলনও প্রকাশিত হয়েছিল। এতে ১৩৩টি গান স্থান পায়।
২.
হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার স্নানঘাট গ্রামের ফকিরবাড়িতে দীনহীন অর্থাৎ শাহ মুনশি জহির উদ্দিন জন্মগ্রহণ করেন। শাহ করম আলী নামে তাঁদের এক পূর্বপুরুষ পিরস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য লোক তাঁর মুরিদান ছিলেন। সেই সুবাদে তিনি শিষ্যদের বাড়ি ঘুরে বেড়াতেন। একবার ঘুরতে ঘুরতে তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার কুমিল্লা মহকুমায় যান এবং সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমান কুমিল্লা জেলার জগন্নাথপুর গ্রামে তাঁর নামখচিত একটি সমাধিও রয়েছে। এসব কারণেই হবিগঞ্জের স্নানঘাটের তাঁর গ্রামের বাড়িটি 'ফকিরবাড়ি' হিসেবে এলাকায় পরিচিতি পায়। শাহ করম আলীর অপর ভাই শাহ বদর উদ্দিন স্নানঘাটেই বসবাস করতেন। শাহ বদর উদ্দিনের ছিল এক ছেলে, তাঁর নাম শাহ সফর উদ্দিন। শাহ সফর উদ্দিনের দুই ছেলে জন্ম নেয়। এঁরা হচ্ছেন যথাক্রমে শাহ আরব উদ্দিন ও শাহ মুনশি জহির উদ্দিন। এই শাহ মুনশি জহির উদ্দিনই দীনহীন নামে গান রচনা করে পরিচিতি পান। দীনহীনের পাঁচ ছেলে ও তিনি মেয়ে ছিল, এঁরা প্রত্যেকেই এখন প্রয়াত। তাঁর ছেলেদের নাম হচ্ছে : শাহ গোলাম নবী, শাহ গোলাম হায়দর, শাহ গোলাম হোসেন, শাহ চান মিয়া ও শাহ সুরুজ মিয়া।
৩. গানের সংকলনটির প্রকাশকের ঠিকানা ছিল এ রকম : 'প্রকাশক-শাহ গোলাম মরতুজা উর্পে আবু মিয়া, সাং স্নানঘাট, পো. পুটিজুরী, হবিগঞ্জ, সিলেট, পূর্ব পাকিস্তান।' গ্রন্থটির প্রকাশক গোলাম মোর্তুজা ওরফে আবুল মিয়া ছিলেন সম্পর্কে দীনহীনের নাতি। এই সংস্করণে প্রকাশক গোলাম মোর্তুজারও তিনটি গান সংকলনভুক্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে এটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন ওই পরিবারেরই সদস্য শাহ আশরাফ উদ্দিন শামীম। দ্বিতীয় সংস্করণে দীনহীনের জনৈক এক ভক্তের কাছ থেকে আরও একটি গান উদ্ধার করে সেটিও সংকলনভুক্ত করা হয়। গোলাম মোর্তুজার তিনটি ছাড়া সর্বশেষ প্রকাশিত সংস্করণ অনুযায়ী দীনহীনের গানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৪টি।